image

লাঙলের জায়গায় এক্সকাভেটর, বদলে যাচ্ছে রাজশাহীর সবুজ চিত্র

জেলা বার্তা পরিবেশক, রাজশাহী

নিস্তব্ধ ভোরের রাজশাহী একসময় জেগে উঠত ধানের পাতায় শিশিরের ঝিলিকে, মাটির গন্ধে আর কৃষকের নিঃশ্বাসে। সেই মাঠের বুকেই আজ নীরবে কাটা পড়ছে জীবিকার শিকড়। লাঙলের দাগ মুছে দিয়ে ঢুকে পড়ছে এক্সকাভেটরের দাঁত ফসলি জমি রূপ নিচ্ছে গভীর গহ্বরে, যেখানে জলের নিচে ডুবে যাচ্ছে খাদ্যের ভবিষ্যৎ। লাভের হিসাবের আড়ালে ক্ষয়ে যাচ্ছে উর্বর মাটি, ভেঙে পড়ছে কৃষিভিত্তিক জীবন, আর ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে প্রকৃতির ভারসাম্য। এই পরিবর্তন শুধু জমির নয় এ এক মানুষের গল্প, এক অঞ্চলের স্মৃতি ও নিরাপত্তার গল্প, যা রাজশাহীর মাঠে মাঠে আজ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাজশাহীতে ফসলি জমি কেটে চলছে পুকুর খনন। আর এই পুকুর খনন করে চলছে বাণিজ্যিকভাবে মাছচাষ। আর এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে চাষাবাদ। একই সঙ্গে ক্ষতি হচ্ছে মাটিরও। দুর্বল নিয়ন্ত্রক তত্ত্বাবধানে টেকসই ভূমি ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে রাজশাহী জেলায় ১৬ হাজার ১৫৯ হেক্টর ফসলি জমির ক্ষতি হয়েছে। আর এই সময়ের মধ্যে বেড়েছে পুকুরও। একই সঙ্গে ফসলি জমিতে গড়ে উঠছে আবাসিক ভবন, রাস্তাঘাট এবং বাণিজ্যিক কাঠামো। এর ফলে কৃষিকাজের বিশাল অংশ স্থায়ীভাবে অপসারণ হচ্ছে। ২০২৩ সালে অভ্যন্তরীণ জলাভূমির পরিমাণ বেড়ে ২৪ হাজার ৪৯৮ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। ২০১৫ সালে ছিল ১৫ হাজার ৪৪ হেক্টর।

রাজশাহী জেলা মৎস্য অফিসের তথ্যনুযায়ী, রাজশাহীতে পুকুরের সংখ্যা ২০১৫ সালে ৪০ হাজার ৭৮৮টি ছিল। ২০২৫ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজান ২৭৫টিতে। যা এক দশকে প্রায় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারি এই হিসাবের বাইরেও আরও বেশি পুকুর খনন চলছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজশাহীতে ৮৪ হাজার ৮০৩ টন মাছ উৎপাদন হয়েছে। স্থানীয় চাহিদা ছিল ৫২ হাজার ৬৩ টন, যা মৎস্য চাষের ব্যাপক সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দেয়।

পুকুর খননের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ হলেও মাঝেমধ্যে তা সহিংস হয়ে উঠছে। গত ১৭ ডিসেম্বর মোহনপুর উপজেলার বারো পালশা গ্রামের কৃষক আহমেদ জুবায়ের (২২) মধ্যরাতে অবৈধ পুকুর খননের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সময় খননকারী যন্ত্রের আঘাতে নিহত হন। এর মামলা হলেও প্রকৃত অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন উপজেলায় পুকুর খনন করার জন্য এস্কাভেটর জব্দ ও পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনাও ঘটছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং কৃষকরা জানান, রাজশাহীজুড়ে হারিয়ে যাওয়া উচ্চ-ফলনশীল আবাদযোগ্য জমির বেশির ভাগই বাণিজ্যিক মাছের পুকুর রূপান্তরিত করা হয়েছে। যা মাটি সংরক্ষণ নির্দেশিকা এবং কৃষি জমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন ২০১৮ লঙ্ঘন করে। তবে কৃষক এবং বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তাদের অভিযোগ, প্রকৃত সংখ্যাটি উল্যেখযোগ্যভাবে বেশি হতে পারে। রাজশাহীতে বিপুল সংখ্যক অনিবন্ধিত এবং অবৈধ পুকুর রয়েছে।

কৃষক এবং জমির মালিকরা বলছেন, বেশি লাভের আশাতে ফসলি জমিতে পুকুর করা হচ্ছে। বাণিজ্যিকভাবে মাছচাষ বোরো ধানের মতো ঐতিহ্যবাহী ফসলের তুলনায় দ্রুত এবং উল্যেখযোগ্যভাবে বেশি লাভ দিচ্ছে। তাই তারা বাধ্য হয়ে পুকুর খনন করছেন। আর এতে সহায়তা করছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালীরা।

গোদাগাড়ী উপজেলার আব্দুর রহমান নামের কৃষক বলেন, ধান চাষ থেকে আমি বছরে ৪০ হাজার টাকা আয় করতে পারি। কিন্তু একই জমি বাণিজ্যিক পুকুরের জন্য লিজ দিলে বছরে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা আয় হয়। চাষাবাদে করে দাম না পেলে পুরো টাকা ক্ষতি হয়ে যায়। কিন্তু পুকুর হিসেবে লিজ দিলে তা আর ক্ষতি থাকে না।

গোদাগাড়ীতে সম্প্রতি ৪০ বিঘা আবাদি জমিতে পুকুর খননকারী এক মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মাছ চাষ থেকে ফসল উৎপাদনের লাভ কয়েকগুণ বেশি। মাছচাষ করে মাসেও ভালো আয় করা যাচ্ছে।

বিধিমালা অনুযায়ী, ফসলি জমিতে পুকুর খননের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এবং মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট কর্তৃক যাচাইয়ের পর নিশ্চিত করতে হবে যে জমিটি অত্যন্ত উর্বর নয়। তবে কেউই এই অনুমোদন নিচ্ছে না। বেশির ভাগ পুকুরই খনন করা হচ্ছে রাতে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর রাজশাহী বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক ড. আজিজুর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নাটোর, নওগাঁ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে অবৈধ পুকুর খনন বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজশাহীতেও ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজশাহীর মাছ ব্যবসায়ীরা পাশের জেলাগুলোতে এখন গিয়ে পুকুর খনন করছেন। সেখানে জমির ইজারা খরচ অনেক কম। তিনি বলেন, আমাদের বেশিরভাগই প্রান্তিক কৃষক। যদি বিলের মাঝখানে পুকুর খনন করা হয়, তাহলে আশপাশের খেত জলমগ্ন হয়ে যায়। চাষাবাদও অসম্ভব হয়ে পড়ে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রপ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আল বাকি বরকতুল্লহা বলেন, স্বল্পমেয়াদে অল্প কিছু লোকের জন্য লাভজনক। কিন্তু আবাদি জমিকে পুকুরে রূপান্তরিত করা খাদ্য উৎপাদন, কৃষকদের জীবিকা এবং দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য নিরাপত্তার উপর প্রভাব ফেলছে।

রাজশাহী জেলা প্রশাসক আফিয়া আখতার বলেন, কৃষি ও মৎস্য কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত উপজেলা পর্যায়ের কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পুকুর খননের অনুমোদন প্রয়োজন। অবৈধ পুকুর খননকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং রাতের অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

এদিতে কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু পুকুর বনাম ধানের নয় এটি উন্নয়ন বনাম টেকসই ভবিষ্যতের। আজ যে লাভের অঙ্কে উচ্ছ্বসিত হয়ে ফসলি জমি জলমগ্ন করা হচ্ছে, তার মূল্য দিতে হবে আগামী প্রজন্মকে খাদ্য ঘাটতি, জীবিকা সংকট ও পরিবেশগত ঝুঁকির মাধ্যমে। কঠোর আইন প্রয়োগ, স্বচ্ছ অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং কৃষকবান্ধব ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে রাজশাহীর সবুজ মাঠ আরও দ্রুত হারিয়ে যাবে নীরব গহ্বরে। তখন ক্ষতির হিসাব শুধু পরিসংখ্যানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না তা ছড়িয়ে পড়বে মানুষের পেটে, প্রকৃতির ভারসাম্যে এবং একটি অঞ্চলের আত্মপরিচয়ে।

‘সারাদেশ’ : আরও খবর

সম্প্রতি

Sangbad Image

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি: বিকাশের নতুন উদ্যোগ ‘বি হাইভ’