উত্তরাঞ্চলের শস্যভাণ্ডারখ্যাত সীমান্তবর্তী জেলা শহর জয়পুরহাট। ঋতুচক্রের পরিবর্তনে এখন চলছে তীব্র শীতকাল। এই শীতে মাঠে মাঠে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য ছড়িয়ে দিয়েছে সরিষার হলুদ ফুল। দিগন্তজোড়া সরিষার খেত হলুদে সেজে মনোমুগ্ধকর রূপ ধারণ করেছে।
শীতকালে এ জেলায় প্রচুর পরিমাণে আগাম শাকসবজি ও অন্যান্য রবি ফসলের চাষ হয়। এতে একদিকে যেমন কৃষকরা লাভবান হন, তেমনি অন্যদিকে স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিও সচল থাকে এবং জেলার চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। চলতি রবি মৌসুমে শাকসবজি চাষের পাশাপাশি থেমে নেই জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল সরিষার চাষাবাদ।
কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, অন্যান্য ফসলের তুলনায় কম খরচ ও অল্প সময়ে ফলন ঘরে তোলার সুবিধা থাকায় এ বছর সরিষা আবাদি জমির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি বাজারে ভোজ্যতেলের উচ্চমূল্য কৃষকদের সরিষার ভালো দাম পাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হচ্ছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ মৌসুমে জেলায় সরিষা চাষ হয়েছিল ১৪ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমিতে। ২০২৩-২৪ মৌসুমে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২১ হাজার ৩৪৯ হেক্টরে। ২০২৪-২৫ রবি মৌসুমে সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৪ হাজার ১৬৫ হেক্টর, যা অর্জিত হয়। চলতি ২০২৫-২৬ রবি মৌসুমে সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬ হাজার ৫০০ হেক্টর। এ থেকে প্রায় ৩০ হাজার ২৪০ মেট্রিক টন সরিষা উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
চলতি মৌসুমে জেলার ১৬ হাজার ৫০০ হেক্টর সরিষা খেত থেকে মধু সংগ্রহের লক্ষ্যে সরিষা খেতে মধু সংগ্রহের বাক্স বসানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার ৭০টি। এর মাধ্যমে প্রায় ১৫ হাজার ৬৮০ কেজি, অর্থাৎ সাড়ে ১৫ মেট্রিক টন মধু সংগ্রহের আশা করা হচ্ছে।
জেলা সদর উপজেলার ধারকি ঘোনাপাড়া গ্রামের সরিষা চাষি মো. মনোয়ার হোসেন, একই গ্রামের চাষি মো. আলম এবং পাঁচবিবি উপজেলার চাষি রইসুল ইসলাম জানান, গত বছর আলুতে ব্যাপক লোকসানের কারণে এ বছর জেলায় সরিষা চাষে কৃষকদের আগ্রহ বেড়েছে। তারা বলেন, প্রতি বিঘায় প্রায় ৭ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ফলন ও দাম দুটিই ভালো হবে বলে তারা আশা করছেন।
জেলার পাঁচটি উপজেলার মধ্যে চলতি মৌসুমে সবচেয়ে বেশি সরিষা চাষ হয়েছে সদর ও পাঁচবিবি উপজেলায়। সদর উপজেলার কোচাই, বম্বু, দস্তপুর, পুরানাপৈল, সোঁতাহার এবং পাঁচবিবি উপজেলার বাগজানা, আয়মারসুলপুর, কাটিয়া, ফিসকাঘাটসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় সরিষার খেতগুলো এখন ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে।
স্থানীয়রা জানান, সরিষা চাষের ফলে এলাকায় মধু উৎপাদনও বাড়তে শুরু করেছে। পাশাপাশি সরিষা ফুলের সৌন্দর্যে প্রতিদিন বিকেলে প্রকৃতিপ্রেমীরা হলুদ ফুলে ভরা সরিষার খেত দেখতে ভিড় করছেন। কৃষি বিভাগের উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে মৌসুমি পর্যটনেরও সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জয়পুরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (উদ্যান) সাদিয়া সুলতানা বলেন, চলতি মৌসুমে জেলায় ১৬ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে, যা গত রবি মৌসুমের তুলনায় কিছুটা বেশি। আলুর দাম কম পাওয়ায় কৃষকরা এ বছর সরিষা চাষে বেশি আগ্রহী হয়েছেন। কৃষকদের উৎসাহ, উদ্বুদ্ধকরণ ও প্রণোদনার অংশ হিসেবে চলতি রবি মৌসুমে প্রায় ১৪ হাজার কৃষকের মাঝে বীজ ও সার সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি উৎপাদন বাড়াতে চাষ পর্যায়ে নিয়মিত পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেয়া হচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এ মৌসুমে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রায় ৩০ হাজার ২৪০ মেট্রিক টন সরিষা উৎপাদন হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।