সারাদেশের মতো শ্রীমঙ্গলেও জেঁকে বসেছে তীব্র শীত। কনকনে ঠান্ডায় কাঁপছে চায়ের রাজধানী ও পর্যটন নগরী, দেশ-বিদেশে পরিচিত কসমোপলিটন শহর শ্রীমঙ্গল। ভোরের আলো ফোটার আগেই হিমেল হাওয়ার তীব্রতায় নিঃশব্দ হয়ে পড়ে পুরো জনপদ, বিপর্যস্ত হয়ে ওঠে স্বাভাবিক জনজীবন। বৃহস্পতিবার, ০৮ জানুয়ারী ২০২৬ ভোর ৬টায় শ্রীমঙ্গল উপজেলা আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে, যা চলতি মৌসুমে এ অঞ্চলের সর্বনিম্ন। শীতের এমন দাপটে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন ছিন্নমূল, দরিদ্র ও খেটে খাওয়া মানুষ।
শ্রীমঙ্গল যেন শীতকে অন্যভাবেই অনুভব করে। চারদিকে হাওর, পাহাড়, বনাঞ্চল ও বিস্তীর্ণ চা বাগানঘেরা এই উপজেলা ভৌগোলিকভাবেই শীতপ্রবণ। টিলা ও উঁচু পাহাড়ি বনাঞ্চল রাতে দ্রুত তাপ বিকিরণ ঘটায়, ফলে সূর্যাস্তের পরপরই তাপমাত্রা দ্রুত নেমে যায়। দিনের বেলায়ও ঘন কুয়াশার কারণে সূর্যের আলো ঠিকমতো পৌঁছাতে পারে না। গত এক সপ্তাহ ধরে সূর্যের দেখা মিলছে খুব কম বা ক্ষণিকের জন্য উঁকি দিলেও দ্রুতই তা কুয়াশার আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে।
এ অঞ্চলের হাওর ও জলাভূমিও শীতের তীব্রতা বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখছে। জলাভূমির ওপর দিয়ে বয়ে আসা ঠান্ডা বাতাস ও রাতভর জমে থাকা আর্দ্রতা মিলেমিশে সৃষ্টি করছে ঘন কুয়াশা। সন্ধ্যা নামলেই চা বাগান ও হাওর এলাকা ঢেকে যাচ্ছে কুয়াশার চাদরে। ভোর পর্যন্ত সেই কুয়াশা না কাটায় রাস্তা-ঘাটে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে পড়ছে, দুর্ভোগে পড়ছে যানবাহন চলাচল।
চা-বাগান অধ্যুষিত শ্রীমঙ্গলে খোলা বিস্তীর্ণ ভূমি ও সারি সারি গাছের ফাঁক দিয়ে শীতল বাতাস বাধাহীনভাবে প্রবাহিত হয়। ফলে শীতের কামড় এখানে তুলনামূলক বেশি অনুভূত হয়। পাহাড় ও বনাঞ্চল দিনে যেমন সূর্যের আলো আংশিকভাবে আটকে দেয়, রাতে তেমনই ঠান্ডা বাতাস ধরে রেখে দীর্ঘ সময় তাপমাত্রা নিচে নামিয়ে রাখে। এসব প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য মিলেই শ্রীমঙ্গলকে দেশের অন্যতম শীতল অঞ্চল হিসেবে পরিচিত করেছে।
এই শীত সবচেয়ে কঠিন হয়ে উঠেছে শ্রমজীবী মানুষ, চা শ্রমিক ও পথশিশুদের জন্য। ভোরের কনকনে ঠান্ডায় কাজে বের হতে গিয়ে তারা পড়ছেন চরম দুর্ভোগে। অনেককে দেখা যাচ্ছে আগুন জ্বালিয়ে কিংবা পুরনো ও পাতলা কাপড় গায়ে জড়িয়ে কোনোমতে দিন পার করতে। পর্যাপ্ত শীতবস্ত্রের অভাবে ঠান্ডাজনিত রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে।
উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের ইতিহাসে শ্রীমঙ্গল একটি শীতলতম স্থান হিসেবে পরিচিত। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৪ সালে এখানে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৩ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর চার বছর পর, ১৯৬৮ সালে সেই রেকর্ড ভেঙে তাপমাত্রা নেমে আসে ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে—যা দেশের ইতিহাসে অন্যতম সর্বনিম্ন।
প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের জন্য খ্যাত শ্রীমঙ্গল শীতে হয়ে ওঠে আরও নিঃশব্দ ও স্থির। কুয়াশায় মোড়া চা বাগান, পাহাড়ি বন আর হাওরের জলরাশি একদিকে যেমন সৃষ্টি করে মনোমুগ্ধকর দৃশ্য, অন্যদিকে তেমনি এই ৭ ডিগ্রির শীত মানুষের জীবনে ডেকে আনছে কঠিন বাস্তবতা।
গাইবান্ধায় জনজীবন বিপর্যস্ত
প্রতিনিধি, গাইবান্ধা জানান, উত্তরের জেলা গাইবান্ধায় জেঁকে বসেছে হাড় কাঁপানো শীত। জেলাজুড়ে বইছে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ। ঘন কুয়াশা আর হিমেল হাওয়ায় এ অঞ্চলের স্বাভাবিক জনজীবন পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শীতজনিত কারণে গত ২৪ ঘণ্টায় গাইবান্ধা জেলায় শিশু ও বৃদ্ধসহ ৫ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বৃহস্পতিবার সকালে ৯টায় গাইবান্ধা জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। স্থানীয় আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, জেলাজুড়ে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বইছে এবং এই অবস্থা আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে। গত প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে এই জনপদে ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা থাকায় দুপুর পর্যন্ত সূর্যের আলো মাটিতে পৌঁছাতে পারছে না। এর সঙ্গে উত্তর দিক থেকে আসা হিমেল হাওয়া শীতের তীব্রতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
তীব্র শীতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন জেলার চরাঞ্চল ও নিম্ন আয়ের মানুষ। কুয়াশার কারণে সড়কগুলোতে হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করছে যানবাহন। কনকনে শীত উপেক্ষা করে রিকশাচালক, ভ্যানচালক ও কৃষি শ্রমিকরা কাজের সন্ধানে বের হলেও মিলছে না কাক্সিক্ষত আয়। স্থবির হয়ে পড়েছে জেলার স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্য। শীত থেকে বাঁচতে চরাঞ্চলের মানুষকে খড়কুটো জ্বালিয়ে উষ্ণতা নিতে দেখা গেছে। শীতের প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শীতজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব। জেলা সদরসহ বিভিন্ন হাসপাতালে শিশু ও বয়স্ক রোগীর ভিড় বাড়ছে। এদিকে মৃত্যুর সংবাদে আতঙ্কও বাড়ছে।
সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে শীতবস্ত্র বিতরণ কার্যক্রম শুরুহয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দের পরিমাণ অত্যন্ত কম। বিশেষ করে চরাঞ্চলের হতদরিদ্র মানুষ এখনও পর্যাপ্ত সহায়তা পাননি বলে জানিয়েছেন। গাইবান্ধা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২২ হাজার কম্বল বিতরণ করা হয়েছে এবং আরও চাহিদা চেয়ে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা গণউন্নয়ন কেন্দ্রের পক্ষ থেকেই শীতার্তদের মাঝে কম্বল বিতরণ করা হচ্ছে। এই সংস্থাটির পক্ষ থেকে ১ হাজার নারী পুরুষের মাঝে কম্বল বিতরণ করা হয়েছে বলে জানান নির্বাহী প্রধান এম আবদুস সালাম।
সরকারি-বেসরকারিভাবে শীতবস্ত্র বিতরণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন এই অঞ্চলের শীতার্ত মানুষজন।
সারাদেশ: ফিশিং বোটে নিষিদ্ধ ট্রলিং সরঞ্জাম