উত্তরাঞ্চলের জেলা গাইবান্ধার অর্থনীতির আকাশে দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক ধরে শিল্পায়নের কালো মেঘ জমে আছে। কৃষিপ্রধান এই জনপদে ভারী শিল্পকারখানা না থাকা এবং বিসিক শিল্পনগরীর বেহাল দশার কারণে কর্মসংস্থানহীন হয়ে পড়েছে লাখ লাখ তরুণ। স্থানীয়ভাবে কাজের সুযোগ না থাকায় জেলাজুড়ে দারিদ্র্যের হার কমছে না, বরং কর্মহীন মানুষ বাধ্য হয়ে পাড়ি জমাচ্ছে অন্য জেলায়।
এক স্থবিরতার প্রতিচ্ছবি গাইবান্ধা বিসিকের তথ্যমতে, ১৯৮৭ সালে জেলা সদরের ধানঘড়া এলাকায় ১৫ একর জমির ওপর এই শিল্পনগরীর যাত্রা শুরু হয়। ১৯৯৮ সালে কার্যক্রম শুরু হলেও আজ ৩৫ বছর পর চিত্রটি অত্যন্ত হতাশাজনক।
বিসিকে মোট ১০৫টি প্লট রয়েছে, যার সবকটি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। অথচ সরেজমিনে দেখা গেছে, ৩৫ শতাংশ প্লটে আজ পর্যন্ত কোনো কারখানা গড়ে ওঠেনি। অনেক উদ্যোক্তা প্লট দখল করে রাখলেও উৎপাদনে যাননি।
৫৩টি শিল্প ইউনিটের মধ্যে প্রায় ২১টি ইউনিট লোকসান ও নানা সংকটে বহু বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে হাতেগোনা কয়েকটি সরিষার তেলের মিল ও ক্ষুদ্র কারখানা কোনোমতে টিকে আছে।
শিল্পনগরীর ভেতরে চলাচলের রাস্তাগুলোর পিচ উঠে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থা অকার্যকর হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই হাঁটুসমান পানি জমে। এছাড়া সীমানা প্রাচীর না থাকায় বিসিক এলাকা এখন অনেকটাই অরক্ষিত।
এদিকে, ভারী শিল্পের হাহাকার ও বন্ধ চিনিকল গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী রংপুর চিনিকলটি ২০২০ সাল থেকে উৎপাদন বন্ধ করে আছে। এর ফলে কেবল হাজার হাজার শ্রমিকই বেকার হননি, বিপাকে পড়েছেন ৫০ হাজার আখচাষিও। জেলায় বিকল্প কোনো ভারী শিল্প না থাকায় কৃষিপণ্য সংরক্ষণের সুযোগ নেই। ফলে ভুট্টার জেলা হিসেবে পরিচিত গাইবান্ধার কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাস সংযোগ। বগুড়া থেকে রংপুর পর্যন্ত গ্যাস লাইন গাইবান্ধার ওপর দিয়ে গেলেও, এই জেলায় কোনো পয়েন্ট বা স্টেশন রাখা হয়নি। গাইবান্ধা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি বলেন, গ্যাস না থাকায় বড় উদ্যোক্তারা এখানে বিনিয়োগ করতে সাহস পাচ্ছেন না। অথচ গ্যাস থাকলে এখানে টেক্সটাইল বা এগ্রো-বেজড বড় শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব ছিল।
দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র ও অভিবাসন শিল্পায়নের এই বন্ধ্যাত্বের সরাসরি প্রভাব পড়ছে জেলার দারিদ্র্য পরিস্থিতির ওপর। স্থানীয় কর্মসংস্থান না থাকায় সিজনাল মঙ্গা, বিশেষ করে আশ্বিন-কার্তিক মাসে কৃষি কাজ না থাকায় প্রান্তিক পরিবারগুলোতে এখনো খাদ্যাভাব দেখা দেয়।
জেলার সাঘাটা, সদর, ফুলছড়ি ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলার চরাঞ্চলের বিশাল জনগোষ্ঠী এখন রাজধানীমুখী। বেঁচে থাকার তাগিদে তারা রিকশা চালনা বা পোশাক কারখানায় স্বল্প মজুরিতে কাজ করছে। শিক্ষিত যুবকরা নিজ জেলায় কাজের সুযোগ না পেয়ে হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছেন।
উদ্যোক্তা মাহবুবা বেগম বলেন, আমরা বিসিকে জায়গা চাইলেও পাই না, কারণ প্রভাবশালীরা প্লট নিয়ে ফেলে রেখেছে। এদের লিজ বাতিল করে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের জায়গা দেয়া হলে অন্তত কিছু মানুষের কর্মসংস্থান হতো।
সম্ভাবনার আলো যেখানে তবে আশার কথা হলো, গোবিন্দগঞ্জে বন্ধ চিনিকলের জমিতে একটি ইপিজেড (রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল) স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গোবিন্দগঞ্জের নাট্যকর্মী গোপাল মোহন্ত জানান গাইবান্ধায় ইপিজেড স্থাপন হলে দারিদ্রতার বৃত্ত থেকে জেলা বের হতে পারবে।
এছাড়া গোবিন্দগঞ্জের কোচাশহরের ক্ষুদ্র হোঁসিয়ারি শিল্পকে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দিলে এটি একটি বড় কুটির শিল্পে রূপ নিতে পারে।
বিসিক গাইবান্ধায় জিইউকে সুপার টেস্টি ফুড প্রোডক্টস-এর ব্যবস্থাপক অখিল চন্দ্র বর্মন জানান, বিসিক-এর অভ্যন্তরে অত্যন্ত নাজুক অবস্থা। রাস্তাঘাট, ড্রেনেজ, নিরাপত্তা কোনটিই নাই। নিজেদের ব্যবস্থাপনায় চালাতে হচ্ছে।
উন্নয়ন গবেষক ও গণউন্নয়ন কেন্দ্রের নির্বাহী প্রধান এম. আবদুস্ সালাম জানান, গাইবান্ধাকে দারিদ্র্যমুক্ত করতে হলে বিসিকের বরাদ্দকৃত কিন্তু অব্যবহৃত প্লটগুলোর লিজ দ্রুত বাতিল করে নতুন উদ্যোক্তাদের দিতে হবে। জেলায় জরুরিভিত্তিতে গ্যাস সংযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প স্থাপনে বিশেষ ঋণ সুবিধা দিতে হবে।
শিল্পায়নের চাকা সচল না হলে গাইবান্ধার ২৫ লাখ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সারাদেশ: ফিশিং বোটে নিষিদ্ধ ট্রলিং সরঞ্জাম