বারোই মার্চের সেই সকালটি যেন আজও থমকে আছে রাশিদা বেগমের ঘরে। ঘড়ির কাঁটা এগিয়েছে, ঋতু বদলেছে, ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টেছে কিন্তু ভাই এজাহার আলী আর ফেরেননি। দশ মাস ধরে এক বোন বুকের ভেতর জমে থাকা প্রশ্ন, আশঙ্কা আর ক্ষীণ আশার ভার বয়ে চলেছেন। প্রতিটি ভোর তার কাছে নতুন করে জেগে ওঠা আতঙ্ক, আর প্রতিটি সন্ধ্যা দীর্ঘশ্বাসে ভেজা এক অপেক্ষার নাম।
পবা উপজেলার জাগীর গ্রামের পথ, হাট-বাজার, থানার বারান্দাসবখানেই ঘুরেছে রাশিদার পা। মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে একই উত্তর “কিছু জানা নেই।” তবু থামেনি খোঁজ। কারণ ভাই হারিয়ে যাওয়ার শূন্যতা শুধু একটি মানুষ হারানো নয়; এটি একটি পরিবারের ভেঙে পড়া স্বপ্ন, একটি বোনের নির্ঘুম রাত, আর প্রতিটি প্রার্থনায় ঝরে পড়া অশ্রু। এই গল্প কেবল নিখোঁজের খবর নয়, এটি ভালোবাসার সাক্ষ্য যেখানে আশা এখনও নিভে যায়নি। হয়তো কোনো একদিন, কোনো এক অচেনা পথে, এজাহার আলী ফিরে আসবেন আর বোনরাশিদার দীর্ঘ অপেক্ষা শেষ হবে। ততদিন এই খোঁজ চলবে, এই বুকভাঙা আকুতি বাতাসে ভেসে বেড়াবে।
গেল বছরের ১২ মার্চে বাড়ি থেকে বের হন এজাহার আলী। দীর্ঘ ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও তিনি আর ফেরেননি। তার বোন রাশিদা বেগম এখনও ভাইকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন।
পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নের জাগীর গ্রামের বাসিন্দা এজাহার আলী (৫৩)। তিনি ওই গ্রামের আমজাদ আলীর ছেলে। গেল বছরের নভেম্বর মাসে ২৭ তারিখে কাটাখালী থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন তার বোন রাশিদা বেগম।
কিন্তু পুলিশও খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়েছে।
রাশিদা বেগম সাধারণ ডায়েরিতে উল্যেখ করেছেন, গতকাল বুধবার সকাল ১১টায় বাড়ি থেকে বের হন। এরপর থেকে বাড়ি ফেরেননি তিনি। বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজিও করা হয়েছে তাও পাওয়া যায়নি। কিন্তু এখনও খোঁজাখুঁজি চলছে এহাজার আলীর।
রাশিদা বেগম বলেন, দীর্ঘ সময়ে ফিরে না আসার কারণে আমরা চিন্তিত। তাকে সব স্থানে খোঁজাখুঁজি করা হয়েছে। এখনও অপেক্ষায় আছি সে ফিরে আসবে।
আইনের খাতায় এজাহার আলী এখনও একজন নিখোঁজ মানুষ, কিন্তু রাশিদার জীবনে তিনি প্রতিদিনের নাফেরা যন্ত্রণা। যে ভাইটি একদিন বাড়ির উঠোন পেরিয়ে বেরিয়েছিল, তার ফেরার পথ আজও চোখে চোখে খোঁজেন বোন। নিঃশব্দ এই অপেক্ষা শুধু একটি পরিবারের নয়— এটি মানুষের সম্পর্ক, ভালোবাসা আর হারিয়ে যাওয়ার গভীর বেদনার এক মানবিক দলিল।