জিরো টলারেট ঘোষণা কাগজেই সীমাবদ্ধ
তিস্তা নদী থেকে অবৈধ পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে জিরো টলারেট নীতির ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে তার কোনো কার্যকর প্রতিফলন নেই। একের পর এক যৌথ অভিযান, মোবাইল কোর্ট ও জব্দ কার্যক্রমের পরও প্রভাবশালী পাথর উত্তোলনকারী সিন্ডিকেটকে থামানো যাচ্ছে না। এতে প্রশ্নের মুখে পড়েছে রংপুর ব্যাটালিয়ন (৫১ বিজিবি), পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর বাস্তব ভূমিকা নিয়ে।
নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় তিস্তা নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট, বিশেষ করে টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের বার্নির ঘাট, তেলীর বাজার, তিস্তা বাজার, চরখড়িবাড়ি, বাইশপুকুর, কালীগঞ্জ ও ভেন্ডাবাড়ি এলাকায় দিনের পর দিন নির্বিচারে পাথর উত্তোলন চলছে। অভিযোগ রয়েছে, শ্যালো ইঞ্জিনচালিত নৌকায় লোহার তৈরি যন্ত্র বসিয়ে নদীর তলদেশে গভীর গর্ত করে পাথর উত্তোলন করছে একাধিক প্রভাবশালী চক্র।
উপজেলা প্রশাসন একাধিকবার অভিযান পরিচালনা করেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরানুজ্জামান ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রওশন কবিরের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে বিপুল পরিমাণ অবৈধ পাথরের স্তূপ জব্দ করা হয়। এসব অভিযানে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (৫১ বিজিবি), ডিমলা থানার পুলিশ ও আনসার ভিডিপি সদস্যরা সহযোগিতা করেন। কিছু ক্ষেত্রে পাথর উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত ইঞ্জিনচালিত নৌকা ও যন্ত্রাংশও ধ্বংস ও জব্দ করা হয়।
তবে বাস্তবতা হলো- একাধিক অভিযান চালিয়েও অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। এলাকাবাসীর অভিযোগ, অভিযান শেষ হলেই আবার আগের মতো শুরু হয় পাথর তোলা। এতে প্রমাণ হচ্ছে, সিন্ডিকেটটি এতটাই শক্তিশালী যে প্রশাসনিক পদক্ষেপ তাদের জন্য কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে না।
স্থানীয়দের ভাষ্য, অবৈধ পাথর উত্তোলনের ফলে তিস্তা নদীর ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। প্রতি বছর ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড নদীভাঙন রোধে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করলেও বাস্তবে সুফল মিলছে না। বরং নতুন নতুন এলাকায় ভাঙন দেখা দিচ্ছে। সম্প্রতি খালিশা চাপানি ইউনিয়নের ছোট খাতা সুপরিটরি গ্রামে শত শত একর আবাদি জমি নদীতে চলে গিয়ে নতুন চ্যানেল তৈরি হয়েছে।
গত বর্ষায় ডিমলা উপজেলার ১০ ইউনিয়নের মধ্যে অন্তত ৬টি এলাকায় মারাত্মক নদীভাঙন দেখা দেয়। ভাঙনে বহু পরিবার সর্বস্বান্ত হয়েছে। অথচ একই নদী থেকে অবাধে পাথর উত্তোলন চলছেই।
অভিজ্ঞ মহলের অভিযোগ, তিস্তা নদী থেকে অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধের মূল দায়িত্ব ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের হলেও সংস্থাটি কার্যত নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। অভিযোগ রয়েছে, পাউবোর সংরক্ষিত এলাকায় অবৈধভাবে উত্তোলিত পাথর স্তূপ করে রাখার সুযোগ দিয়ে একটি পক্ষ এই অবৈধ ব্যবসাকে পরোক্ষভাবে সহায়তা করছে। এতে তিস্তা ব্যারেজ ও বৃহত্তর সেচ প্রকল্পকে নস্যাৎ করার গভীর ষড়যন্ত্রের অভিযোগও উঠেছে।
রংপুর ব্যাটালিয়নের (৫১ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সেলিম আল দীন একাধিকবার অবৈধ বালু ও পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিলেও স্থানীয়দের অভিযোগ- এই ঘোষণা বাস্তবে মুখে-মুখেই সীমাবদ্ধ।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরানুজ্জামান বলেন, তিস্তা নদী থেকে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে উপজেলা প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। অভিযান অব্যাহত থাকবে। কাউকে কোনো ছাড় দেয়া হবে না। অন্যদিকে বিজিবি অধিনায়ক বলেন, সীমান্ত এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় বিজিবি সচেষ্ট রয়েছে। অবৈধ বালু ও পাথর উত্তোলন পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এ ধরনের কাজে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। স্থানীয়দের মতে, ঘোষণা আর বাস্তবতার এই ফারাকই প্রমাণ করছে তিস্তা নদী এখনও অবৈধ পাথর উত্তোলনকারীদের জন্য একপ্রকার ‘স্বর্গরাজ্য’। দ্রুত কার্যকর ও ধারাবাহিক কঠোর ব্যবস্থা না নিলে প্রতি বছর সরকারের কোটি কোটি টাকার নদী রক্ষা প্রকল্প ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কাই বাড়ছে।