ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভাজুড়ে কালের বিবর্তন ও আধুনিক যন্ত্রসভ্যতার দাপটে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার একসময়ের অপরিহার্য ঐতিহ্যবাহী উপকরণ ঢেঁকি। একসময় ধান থেকে চাল ভাঙা, চালের আটা তৈরি কিংবা পিঠে-পুলির প্রস্তুতিতে ঢেঁকি ছিল গ্রামের প্রতিটি ঘরের নিত্যসঙ্গী। আজ বৈদ্যুতিক ও ডিজেলচালিত মিল-মেশিনের আগ্রাসনে সেই ঢেঁকি হারিয়ে যাচ্ছে নীরবে, হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ জীবনের এক অনন্য সাংস্কৃতিক চিহ্ন।
একসময় মহেশপুর উপজেলার প্রায় প্রতিটি গ্রামেই সকালে কিংবা গভীর রাতে ঢেঁকির ঠকঠক শব্দ শোনা যেত। অগ্রহায়ণ মাসে নতুন ধান ঘরে ওঠার পর কিংবা পৌষ সংক্রান্তিকে ঘিরে ঢেঁকির তালে তালে মুখর হয়ে উঠত পাড়া-মহল্লা। নারীদের সম্মিলিত শ্রম, হাসি-ঠাট্টা আর ঢেঁকির ছন্দে গ্রামের পরিবেশ হয়ে উঠত উৎসবমুখর। অনেক সম্ভ্রান্ত পরিবারে ছিল আলাদা ‘ঢেঁকিঘর’, যেখানে শুধু চাল ভাঙাই নয় পিঠে-পুলি, খেজুরের গুড় মেশানো নানা ঐতিহ্যবাহী খাবারের আয়োজন হতো। ঢেঁকিতে ভাঙা চাল ছিল স্বাদে অতুলনীয় ও পুষ্টিগুণে ভরপুর। এই চাল ও চালের আটা বিক্রি করে উপজেলার বহু দরিদ্র পরিবার জীবিকা নির্বাহ করত। গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত ঢেঁকি ছাঁটা চালের আলাদা কদর ছিল। কিন্তু সময়ের প্রয়োজনে আধুনিক ধান ও গম ভাঙার মেশিন চালু হওয়ায় অল্প সময়ে বেশি কাজ হওয়ায় মানুষ ঝুঁকছে যন্ত্রের দিকে। ফলে ধীরে ধীরে ঢেঁকির ব্যবহার কমে গিয়ে আজ বিলুপ্তির পথে।
এলাকার প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় বিয়ে, নতুন জামাই আগমন কিংবা বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ঢেঁকির ব্যবহার ছিল অপরিহার্য। গভীর রাত পর্যন্ত ধান ভাঙার শব্দে গ্রাম জেগে থাকত। অথচ এখন সেই শব্দ আর শোনা যায় না। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই ঢেঁকি শুধু গল্পেই জেনেছে, বাস্তবে দেখার সুযোগ পাচ্ছে না।
মহেশপুর উপজেলার যাদবপুর ইউনিয়নের পাথরা গ্রামের গৃহিণী সামজিদা বেগম বলেন, বিয়ের পর থেকেই ঢেঁকি দিয়ে ধান ভেঙে চাল ও আটা বানিয়েছি। আগে আশপাশের গ্রাম থেকেও মানুষ আসত ঢেঁকিতে আটা বানাতে। এখন সবাই মেশিনে যায়, ঢেঁকি পড়ে আছে অব্যবহৃত। স্থানীয় আরেক বাসিন্দা আক্ষেপ করে বলেন, প্রযুক্তি আমাদের কাজ সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামবাংলার বহু ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। ঢেঁকির মতো জিনিস হয়তো কয়েক বছর পর শুধু ইতিহাসের পাতায়ই থাকবে। সচেতন মহলের মতে, যন্ত্রে ভাঙা চালে ঢেঁকি ছাঁটা চালের মতো স্বাদ ও পুষ্টিগুণ পাওয়া যায় না। তারা মনে করেন, গ্রামবাংলার ঐতিহ্য রক্ষা ও নতুন প্রজন্মকে এর সঙ্গে পরিচয় করাতে ঢেঁকির মতো সাংস্কৃতিক উপাদান সংরক্ষণে উদ্যোগ নেয়া জরুরি। নচেৎ মহেশপুরের গ্রামীণ জীবনের এই ঐতিহ্য আগামী দিনে থেকে যাবে কেবল স্মৃতি আর গল্পের।