কুষ্টিয়া, গজারিয়া, চাটখিল ও সোনাইমুড়ীতে জলাতঙ্ক (র্যাবিস) প্রতিরোধী ভ্যাকসিনের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সরকারি হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্র এমনকি ফার্মেসিগুলোতেও এই রোগের ভ্যাকসিন মিলছে না।
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, জেলা জুড়ে দীর্ঘদিন ধরে ভ্যাকসিন না পাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন আক্রান্ত রোগী ও তাদের স্বজনরা। কুকুর, বিড়াল, বানর ও বেজির কামড়ে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন অসংখ্য রোগী হাসপাতালে এলেও প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন না পেয়ে ফিরছেন হতাশ হয়ে।
এক ভুক্তভোগী জানান, আমার মাকে ৫-৬ দিন আগে একটি বিড়াল কামড়েছে। এখন পর্যন্ত দুই ডোজ ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে। তৃতীয় ডোজ দেওয়ার কথা। কিন্তু কুষ্টিয়ার আমিন ফার্মেসি, এর আগে কুমকুম ফার্মেসি এবং ইনসেপ্টা কোম্পানির ডিপোতেও খোঁজ করে কোথাও ভ্যাকসিন পাইনি। পরের সপ্তাহে পাওয়া যেতে পারে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, কিন্তু পাব কিনা নিশ্চিত না। এখন ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজতে হবে।
অনেকে জানান, কিন্তু কুষ্টিয়ার কোথাও ভ্যাকসিন নেই। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে সংকট চলছে। কুষ্টিয়ায় একটি মেডিকেল জেলা হওয়া সত্ত্বেও জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন না পাওয়া খুবই দুঃখজনক। যাদের কুকুর কামড়েছে, তাদের অবস্থা কতটা ভয়াবহ তা ভাবতেই ভয় লাগে। সময়মতো ভ্যাকসিন না পেলে জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
কুষ্টিয়া শহরের মেরিন ফার্মেসির স্বত্বাধিকারী মোকারম হোসেন জানান, আমাদের ফার্মেসিতে প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৪৫টি র্যাবিস ভ্যাকসিন বিক্রি হতো। আমাদের মতো আরও অনেক ফার্মেসি এই ভ্যাকসিন সরবরাহ করত। ইনসেপ্টা ও পপুলার ফার্মাসিউটিক্যাল এই ভ্যাকসিন বাজারে সরবরাহ করে থাকে। ইনসেপ্টা মাঝেমধ্যে দিলেও পপুলার দীর্ঘদিন ধরেই সরবরাহ বন্ধ রেখেছে। এ কারণে গ্রাহকদের সীমাহীন হয়রানি হচ্ছে। জলাতঙ্কের ভ্যাকসিনের কোনো বিকল্প নেই।
কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের জলাতঙ্ক বিভাগে কর্মরত কর্মকর্তা মোহাম্মদ রাজু আহমেদ বলেন, সরকারি পর্যায়ে বর্তমানে ভ্যাকসিন সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এখানে যে রোগী এসেছেন, সবাই বাইরে থেকে ভ্যাকসিন কিনে এনেছেন। তিনি জানান, গত বছরের ২১ নভেম্বর কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে র্যাবিস ভ্যাকসিন সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যায়। দুই সপ্তাহ ধরে র্যাবিস ভ্যাকসিনের তীব্র সংকট চলছে। ফলে রোগীদের ঝিনাইদহ, রাজশাহী ও ঢাকা থেকে আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে ভ্যাকসিন সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. হোসেন ইমাম বলেন, জলাতঙ্ক রোগের জন্য যে র্যাবিস ভ্যাকসিনটি আমরা ব্যবহার করি, তা প্রায় ৬ মাস ধরে সরকারি পর্যায়ে সরবরাহ নেই। গত এক মাস ধরে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। ফলে রোগীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।গজারিয়ায় ঝুঁকিতে আক্রান্ত ও পরিবার
গজারিয়া প্রতিনিধি জানান, উপজেলায় তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী ভ্যাকসিনের। জলাতঙ্ক ভ্যাকসিনের সংকট! ফলে ঝুঁকিতে রয়েছেন আক্রান্ত ব্যক্তি ও পরিবার। সূত্র জানায়, গজারিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেসহ স্থানীয় ফার্মেসীগুলোতেও নেই জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন।
এতে চরম জন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছন ভুক্তভোগীরা। উপজেলায় কুকুর, বিড়ালে আক্রান্ত ভুক্তভোগীরা পড়েছেন জীবনহানির সঙ্কায়।
গজারিয়া উপজেলা ফার্মেসী মালিক সমিতির সভাপতি মিজান ফার্মেসীর স্বত্বাধিকারী মো. মোশারফ সিকদার বলেন, কয়েক মাস ধরে ঔষধ কোম্পানি থেকে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী (রেবিক্স) ভ্যাকসিন সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। তাই গজারিয়ায় ফার্মেসিগুলোতে ভ্যাকসিন সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। এজন্য আক্রান্ত রোগীরা ঢাকা থেকে ভ্যাকসিন আনছেন। তিনি আরো জানান, ঢাকা থেকে আনা ভ্যাকসিনগুলো যদি যথাযথ প্রক্রিয়ায় না আনা হয় তাহলে গুনগতমান নষ্ট হওয়ার সম্ভবনা থাকে।
গজারিয়া উপজেলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ কোথাও জলাতঙ্ক প্রতিরোধের ভ্যাকসিন না পেয়ে, ঢাকার শাহবাগ এলাকার একটি ফার্মেসী থেকে অতিরিক্ত দাম দিয়ে ভ্যাকসিন আনিয়েছি।
গজারিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা পর্যায়ে সরকারী উপায়ে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী ভ্যাকসিন সরবরাহ করা হয় না। গত বছর বিশেষ ব্যবস্থায় ভ্যাকসিন সরবরাহ করা হয়েছিল, বর্তমানে সরবরাহ নেই।চাটখিল ও সোনাইমুড়ীতে আতঙ্ক চাটখিল ও সোনাইমুড়ী প্রতিনিধি জানান, উপজেলায় জলাতঙ্ক রোগ প্রতিষেধক ভ্যাকসিন রেবিক্স বিসি ও রেবিবেক্স নামক ভ্যাকসিন পাওয়া যাচ্ছে না। ভ্যাকসিনের অভাবে কুকুর, বিড়ালের আক্রমনের শিকার লোকজন ভ্যাকসিন না পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। অনেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ভ্যাকসিনের জন্য ছুটাছুটি করছে। প্রতিদিন কুকুর ও বিড়ালের আক্রমণের শিকার লোকজন সরকারি হাসপাতাল সহ বিভিন্ন ঔষধের দোকানে খোঁজাখুঁজি করেও ভ্যাকসিন পাচ্ছেন না।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চাটখিল পৌরসভার পল্লী চিকিৎসক নূর হোসেন পলাশের ছেলে রিজন হোসেন (১৪) গত ৩ জানুয়ারি কুকুরের আক্রমণের শিকার হয়। ৪ জানুয়ারি নোয়াখলা গ্রামের রিকশা চালক নুরুল আলমকে (৩০) কুকুর কামড় দেয়। এখনো তারা ভ্যাকসিন দিতে পারেনি। এছাড়া চাটখিল ও সোনাইমুড়ীতে আরো অনেকেই কুকুর ও বিড়ালের আক্রমণের শিকার হয়েছে। ভ্যাকসিন না পেয়ে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করছে।
চাটখিল উপজেলার ইনসেপ্টা কোম্পানির এরিয়া ম্যানেজার নুরুল আমিন জানান, গত কয়েক মাস আগে তাদের কোম্পানির ৩ লাখ ভ্যাকসিন সরকারকে দিয়েছে। বাজারে সরবরাহ করার মতো ভ্যাকসিন মজুত নেই, তাই সংকট দেখা দিয়েছে। চাটখিল উপজেলার পপুলার কোম্পানির এরিয়া ম্যানেজার আবদুল আলীম জানান, প্রয়োজনীয় কাঁচামালের অভাবে তাদের কোম্পানির ভ্যাকসিন উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। তবে কিছুদিনের মধ্যে উৎপাদন শুরু করতে পারবে বলে আসা করা যাচ্ছে।
চাটখিল উপজেলা স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: খন্দকার মোশতাক আহমেদ ও সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: নুসরাত জাহান জানান, গত কয়েক মাস ধরে ভ্যাকসিন না আসার কারণে এই সংকট দেখা দিয়েছে।