গাইবান্ধা মোল্লার চরের একটি গ্রাম অথবা রংপুর শহরের মডার্ন মোড়-এসবের দৃশ্যপট প্রায় একই। জীর্ণশীর্ণ শরীর, চোখে একরাশ হতাশা আর হাতে ভিক্ষার ঝুলি। উত্তরাঞ্চলের দারিদ্র্যপীড়িত জেলাগুলোতে এভাবেই কাটছে হাজারো প্রবীণ নারীর দিনকাল। যাদের স্বামী নেই, সন্তানরা খোঁজ রাখে না, কিংবা সন্তানরাও চরম দারিদ্র্যের কসাঘাতে জর্জরিত। জীবনসায়াহ্নে এসে এসব নারীর একমাত্র ভরসা এখন সরকারি বয়স্ক ভাতা, অন্যের দয়া অথবা ভিক্ষাবৃত্তি।
উত্তরাঞ্চলের রংপুর বিভাগে বিশেষ করে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও লালমনিরহাটের মতো জেলাগুলোতে নদীভাঙন ও কর্মসংস্থানের অভাবে দারিদ্র্যের হার জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি। এই দারিদ্র্যের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন প্রবীণ নারীরা। ভাতার টাকায় চলে না ওষুধ, জোটে না খাবার বর্তমানে সরকার প্রদত্ত বয়স্ক ভাতার পরিমাণ মাসিক ৬০০ টাকা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে এই সামান্য টাকায় একজন মানুষের মাসিক খাবার খরচ তো দূরের কথা, প্রয়োজনীয় ওষুধের খরচও মেটানো সম্ভব নয়। রংপুরের পীরগাছা উপজেলার পাওটানা গ্রামের বাসিন্দা ৭০ বছর বয়সী সখিনা বেওয়া বলেন, ‘বাপরে, সরকার যে টাকা দেয়, তা দিয়ে চাল কিনলে ওষুধ কেনার টাকা থাকে না। শরীরে অসুখ বাসা বাঁধছে, কিন্তু ডাক্তার দেখানোর সামর্থ্য নাই। বাধ্য হয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে হাত পাতি।’
সখিনার মতো হাজারো নারী মাসের পর মাস অপেক্ষা করেন ভাতার টাকার জন্য। আর বাকি দিনগুলো কাটে অর্ধাহারে কিংবা অনাহারে।
এক অমানবিক সমীকরণ রংপুর বিভাগের চরাঞ্চলগুলোতে নদীভাঙনের কারণে বহু পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। স্বামী মারা যাওয়ার পর অধিকাংশ নারীই সম্পত্তির উত্তরাধিকার বা কোনো স্থায়ী আয়ের উৎস পান না। পরিসংখ্যান বলছে, রংপুর বিভাগে ৬০ বছরের বেশি নারীর সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ। এরমধ্যে ৮০ শতাংশ ভিক্ষা বৃত্তি অথবা সরকারের ভাতায় জীবন পারছেন। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা কাজের সন্ধানে শহরে বা অন্য জেলায় পাড়ি জমালে, গ্রামে পড়ে থাকা এই বৃদ্ধা মায়েদের দেখার কেউ থাকে না।
সদর উপজেলার নশরৎপুর গ্রামের আজিরন বেওয়া জানান, স্বামী মারা গেছে ৩০ বছর আগে। সন্তানেরা আলাদা সংসার গড়েছে। জমিজমা নেই, এখন একটি প্রতিষ্ঠানে রান্নার কাজে সহায়তা করছি-যা খুবই কঠিন।
গবেষক ও লেখক অধ্যক্ষ জহুরুল কাইয়ুম জানান, সামাজিক অবক্ষয় ও পরিবারের বোঝা সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, যৌথ পরিবার প্রথা ভেঙে যাওয়া এবং সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এই পরিস্থিতির জন্য অনেকাংশে দায়ী। অনেক ক্ষেত্রে সন্তানরা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও বৃদ্ধা মায়ের দায়িত্ব নিতে চান না। আবার অনেক সন্তান নিজেই দিনমজুর, তাদের পক্ষে বাড়তি মানুষের ভরণপোষণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে বৃদ্ধা মাকে মনে করা হয় ‘বোঝা’। এই অবহেলা থেকেই অনেক মা রাস্তায় নামতে বাধ্য হন।
সাঘাটার ব্যবসায়ী আক্তার হোসেন বলেন, শুধু যে, দরিদ্র পরিবারে এই চিত্র তা নয়, উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের বয়স্ক নারীদের শেষজীবন অত্যন্ত কঠিন ও একাকি।
সরেজমিন দেখা যায়, গাইবান্ধা রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, কোর্ট চত্বর, পৌরপার্ক এবং বিভিন্ন বাজারের আশেপাশে বয়স্ক নারীদের ভিক্ষাবৃত্তির হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এদের অনেকেরই থাকার কোনো স্থায়ী জায়গা নেই।
উন্নয়ন গবেষক ও গণউন্নয়ন কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী প্রধান এম. আবদুস্ সালাম জানান, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, শুধু মাসিক ভাতা দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রবীণ নারীদের জন্য প্রয়োজন বিশেষায়িত পুনর্বাসন কেন্দ্র এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ। ভাতার পরিমাণ বাড়ানো এবং তা যেন সঠিক সময়ে তাদের হাতে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
রংপুর বিভাগের সমাজসেবা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তার মতে, ‘আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি বয়স্ক ও বিধবা ভাতার কার্ড সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে। তবে চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ এখনো অপ্রতুল। সমাজের বিত্তবানদেরও এগিয়ে আসা উচিত।’
উত্তরাঞ্চলের এই জনপদগুলোতে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগলেও, বয়স্ক নারীদের জীবনে এখনো লাগেনি স্বস্তির বাতাস। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একটু সম্মান আর দু’মুঠো ভাতের নিশ্চয়তাটুকুই তাদের একমাত্র চাওয়া। এজন্য এসব অসহায় নারীদের জন্য রাষ্ট্র ও সমাজের বিত্তবান ও মানবিক ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার অনুরোধ ভুক্তভোগীদের।
অর্থ-বাণিজ্য: সংকট কাটাতে বাকিতে এলপি গ্যাস আমদানির সুযোগ
অর্থ-বাণিজ্য: ডিএসই’র সূচক থেকে বাদ ১৬ শেয়ার, যুক্ত হচ্ছে ৯টি
অর্থ-বাণিজ্য: সব ব্যাংকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণা চালানোর নির্দেশ
অর্থ-বাণিজ্য: শেয়ারবাজারে লেনদেন নামলো ৩০০ কোটির ঘরে
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি: খিলগাঁওয়ে সাজগোজ এর নতুন আউটলেট উদ্বোধন