চকরিয়ায় বেড়েছে তামাকের ভয়াবহ আগ্রাসন
কৃষি ভান্ডার হিসেবে খ্যাতি পাওয়া অমিত সম্ভাবনার জনপদ কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বিস্তৃত জমিতে বেড়েছে পরিবেশ বিধংসী তামাক চাষের ভয়াবহ আগ্রাসন। সরকারিভাবে এই চাষ বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের বিধান না থাকায় প্রতি বছর শুস্ক মৌসুমে বেড়ে চলছে তামাক চাষের পরিধি। এমন পরিস্থিতিতে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রতি বছর কমছে কৃষিজমি। অন্যদিকে ফসলি জমিতে পরিবেশ বিধংসী তামাক চাষ করার কারণে ফসলিজমি হারাচ্ছে উর্বরতা শক্তি।
বর্তমানে উপজেলার অন্তত আটটি ইউনিয়নে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন বেসুমার জমির পাশাপাশি তামাকের আগ্রাসন দেখা যাচ্ছে মাতামুহুরী নদীর দুই তীরে জেগে ওঠা সরকারি খাস জমিতেও। তামাকের আগ্রাসন থেকে বাদ যাচ্ছে না কয়েকটি ইউনিয়নে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পাহাড়ি টিলা এবং সমতল ভূমিও।
এই প্রেক্ষাপটে উপজেলাজুড়ে বোরো ধান, রবিশস্য, শাক-সবিজসহ রকমারী ফসল তথা নিরাপদ খাদ্যশস্য উৎপাদনে মারাত্মকভাবে প্রভাব দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে উৎপাদিত তামাক শোধন করতে গিয়ে উজাড় হচ্ছে বেসুমার সংরক্ষিত বনাঞ্চল। তামাক চুল্লিতে জ্বালানি হিসেবে পোড়ানোর জন্য সংগ্রহ করা হচ্ছে লাখ লাখ মণ লাকড়ি।
চকরিয়া উপজেলা পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি সিনিয়র সাংবাদিক মাহমুদুর রহমান মাহমুদ বলেন, চকরিয়া উপজেলার বিস্তৃত জমিতে তামাক চাষের পরিধি দিন দিন বাড়তে থাকায় প্রতি বছর নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ব্যবহৃত হচ্ছে। পাশাপাশি তামাক পোড়ানোর জন্য উজাড় করা হচ্ছে সরকারি বনাঞ্চলের বৃক্ষরাজি।
তিনি বলেন, তামাক চাষের চকরিয়া উপজেলার বুকচিড়ে প্রবাহিত মাতামুহুরী নদীতে দেশীয় মাছের বংশবিস্তারের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানির সঙ্গে তামাকের গাছ-গাছালি ভেসে এসে নদীতে পড়ছে। তাতে বিষক্রিয়া তৈরি হয়ে নদীতে মিশে গিয়ে মাছের অভয়াশ্রম ধবংস হচ্ছে।
সরজমিনে উপজেলার তামাক চাষপ্রবণ কয়েকটি ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, এখন যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই তামাকের আবাদ। এসব ইউনিয়নের সিংহভাগ ফসলি জমি গিলে খেয়েছে তামাক চাষ। বিশেষ করে উপজেলার বমুবিলছড়ি, সুরাজপুর-মানিকপুর, কাকারা, ফাঁসিয়াখালী, লক্ষ্যারচর, কৈয়ারবিল ও বরইতলী ইউনিয়নে এবছরও বেড়েছে তামাক চাষ। তবে তামাকের ভয়াবহ আগ্রাসন চলছে পাহাড়ি জনপদের ইউনিয়ন বমু বিলছড়ি, সুরাজপুর-মানিকপুর ও কাকারা ইউনিয়নে। এ তিন ইউনিয়নের ওপর দিয়ে প্রবহমান মাতামুহুরী নদীর দুই তীর ছাড়াও পাহাড়ি টিলা ও সমতল ভূমির অন্তত ৮০ শতাংশ তামাক চাষের আওতায় রয়েছে।
যদিও-বা নদীর দুই তীরে জেগেউঠা চর হচ্ছে সরকারি খাস জমি এবং পাহাড়ি টিলা ও সমতল ভূমি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের আওতাভুক্ত। কিন্তু সেই নদীর তীর, পাহাড়ি ভূমি দখলে নিয়ে এই তামাক চাষ অব্যাহতভাবে চলছে।
জানা গেছে, প্রতি বছর চকরিয়া উপজেলার বমুবিলছড়ি, সুরাজপুর-মানিকপুর, কাকারা, ফাঁসিয়াখালী, লক্ষ্যারচর, কৈয়ারবিল, বরইতলী ইউনিয়নে তামাক চাষ করা হচ্ছে। এছাড়া আরও কয়েকটি ইউনিয়নে আংশিক জমিতে তামাক চাষের বিস্তার ঘটেছে। কৃষি বিভাগ জানায়, উপজেলার ১৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা এলাকায় প্রায় ২২ হাজার হেক্টর চাষের জমি রয়েছে। তন্মধ্যে পাঁচটি ইউনিয়নে তামাক আবাদ হচ্ছে ৬২০ হেক্টর ফসলি জমিতে। বাকি জমিতে বোরো ধান, রবিশস্য, রকমারী শাক-সবজির উৎপাদন হচ্ছে।
কৃষি বিভাগের এই তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতান অনেক গড়মিল রয়েছে বলে জানিয়েছেন দীর্ঘ দেড়যুগ ধরে চকরিয়া অঞ্চলে তামাক চাষের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া এনজিও সংস্থা উন্নয়ন বিকল্পের নীতি নির্ধারণী গবেষণা (উবিনীগ)। সংস্থাটির জরিপ মতে- চকরিয়া উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি, মাতামুহুরী নদীর দুই তীর ও পাহাড়ি টিলা ও সমতল ভূমি মিলিয়ে অন্তত ২০০০ হেক্টরের বেশি জমিতে চাষ হচ্ছে পরিবেশ ও মানুষের জীবন ধংসকারী তামাকের।
উবিনীগ কক্সবাজারের আঞ্চলিক সমন্বয়ক মো. জয়নাল আবেদীন খাঁন বলেন, তামাক চাষের কারণে যেমন জমির উর্বরতা শক্তি কমে যাচ্ছে, তেমনই করে চাষি এবং পরিবার সদস্যসহ আশপাশের মানুষ প্রতি বছর নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তামাক শোধন করতে গিয়ে প্রতি বছর কক্সবাজার ও বান্দরবানের অন্তত ১৫ কোটি টাকার কাঠও পোড়ানো হচ্ছে প্রায় আট হাজার তামাক শোধন চুল্লিতে।
অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন টোব্যাকো কোম্পানিগুলো তাদের মাঠকর্মীদের দ্বারা নানা প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে প্রান্তিক চাষিদের তামাক চাষে উদ্বুদ্ধ করে আসছেন। তামাকে চাষের বিপরীতে প্রয়োজনীয় দাদন, সারের জোগান দেওয়ার কারণে ব্যক্তি মালিকানাধীন বিপুল পরিমাণ জমির পাশাপাশি পার্বত্য অববাহিকার বিভিন্ন নদীর তীর, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের টিলা ও সমতল বনভূমি দখলে নিয়ে সেখানেও দেদারছে তামাক উৎপাদন করে যাচ্ছে। অনেক স্থানে বন বিভাগের কার্যালয়ের পাশে সংরক্ষিত বনভূমির ভেতরে তামাকের আবাদ হলেও কোন ব্যবস্থাই নিচ্ছে না।
তামাক চাষের ভয়াবহতা নিয়ে একই তথ্য জানিয়েছেন পাহাড়ি জনপদ বমুবিলছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনজুরুল কাদের, কাকারা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. সাহাব উদ্দিন। তাদের দাবি, পরিবেশ বিধংসী হলেও তামাক চাষের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট চাষিরা লাভবান হন বেশি। সে কারণে তারা এই চাষ সহজে ছাড়তে চান না। তবে যদি তামাক চাষ সরকারিভাবে নিষিদ্ধ করা না হয়, তাহলে চাষের এই অবস্থা অব্যাহতভাবে চলতে থাকবে।
তামাক চাষিরা জানিয়েছেন, একই জমিতে বারবার তামাক চাষের কারণে জমির উর্বরতা শক্তিও দিন দিন কমে যাচ্ছে। কারণ ভালোমানের তামাক উৎপাদন করতে হলে ওই জমিতে ব্যাপকহারে সার-কীটনাশক প্রয়োগ করতে হয়।
চকরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শাহনাজ ফেরদৌসী বলেন, তামাক চাষ বন্ধ করার বিষয়ে এখনও পর্যন্ত সরকারিভাবে কোন বিধি-নিষেধ নেই। তবে কৃষিজমিতে তামাক চাষকে নিরুৎসাহিত করে রকমারী ফসলের আবাদে ফেরাতে কৃষকদের কৃষি বিভাগের পক্ষথেকে প্রতিনিয়ত পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, এখন তামাক চাষ অধ্যুষিত অঞ্চল খ্যাত কাকারা ইউনিয়নে লাভজনক ফসল তরমুজ চাষ শুরু হয়েছে।
সারাদেশ: কলাপাড়ায় ট্রাকের চাপায় বাইকচালক নিহত