কৃষি দিয়ে জীবিকা নয়, ভবিষ্যৎও গড়া যায়। এমন বুক ভরা আশা নিয়ে সমতল জমিতে কমলা চাষ করতে মাটিতে নেমেই কিস্তিমাত। শুরুতেই চমক দেখিয়ে কমলা চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছে আব্দুল্লাহ। সে চুয়াডাঙ্গার সদর থানার উক্ত গ্রামের আবু জাফরের ছেলে।
আব্দুল্লাহ বলেন, গল্পটা অনেকটা স্বপ্নের মতোই। নানা ব্যবসায় হোঁচট খেয়ে একসময় ছিলেন দিশেহারা হয়ে পড়ি। ছয় বছর আগে এক সহকর্মীর পরামর্শে চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার জয়রামপুর খড়ের মাঠে দুই বিঘা জমিতে কমলা লেবুর বাগান করি। দুই বছরের মাথায় তিন লাখ টাকার ফল বিক্রি করি। সেখান থেকেই মোড় ঘুরে যায়। চার বছরে কমলা বিক্রি করে আয় করেছি ১০ লাখ টাকা বসে না থেকে সঠিক জাতের চারা কিনে বাগান করলে সফল হওয়া যায়। কাজ করা সেখান থেকেই কৃষিকে নতুনভাবে দেখতে শুরু করিন। ডালে থোকায় থোকায় ঝুলে হলুদ কমলা এই কমলাই আমার সহবদলে দিচ্ছে চুয়াডাঙ্গার কৃষি অর্থনীতি আর বহু শিক্ষিত তরুণের জীবনের গল্প। দামুড়হুদার জয়রামপুরের ২ বিঘা জমিতে চলতি উৎপাদন মৌসুমেই খরচ বাদ দিয়ে ৩ বিঘা লাভ হয়েছে ৫ লাখ টাকা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি-কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্প থেকে তিন দিনের প্রশিক্ষণ নিয়ে ওই প্রশিক্ষণই যেন ব্যর্থতা থেকে সাফল্যের পথের চোখ খুলে দেয়। ফল চাষের শুরতেই পারিবারিকভাবে সমর্থন পাইনি। তবে এখন সবাই সাধ্য মতো সহযোগিতা করছেন। দেশের শিক্ষিত তরুণরা এভাবে ফলের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করলে দেশের বেকার সমস্যার বড় অংশের সমাধান হবে। ফলের আমদানি নির্ভরতা কমবে। কয়েক বছরের মধ্যে মধ্যে এলাকায় ফলের রাজ্যে পরিণত হবে। দেশে ফল কেন্দ্রিক এগ্রো ট্যুরিজম গড়ে উঠবে। কমলায় বদলে যাওয়া অর্থনীতি। শুরুটা ছোট হলেও সাড়া পড়ে দ্রুত। বুঝতে পারি খরচ তুলনামূলক কম, লাভ নিশ্চিত। জেলায় কমলা চাষ ঘিরে নতুন করে কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কেউ বাগানের শ্রমিক, কেউ পরিবহন, কেউ আড়তদার, কেউ চারা উৎপাদনে যুক্ত। তার চাষ করা চায়না জাতের কমলার বাজারে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এই বাণিজ্যিকভাবে কমলার চাষ এখন চুয়াডাঙ্গার প্রধান অর্থকরী ফসলের একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কমলা চাষের হাত ধরে আজ স্বাবলম্বী হয়ে নতুন পথের দেখা পেয়েছি। আমার দেখা এই পথে কেউ এলে তাকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করা হবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের তথ্য বলছে, চুয়াডাঙ্গায় বাণিজ্যিকভাবে কমলা চাষ শুরু হয় ২০১৬ সালের দিকে চুয়াডাঙ্গায় এই অর্থবছর পর্যন্তÍ ৭৮ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের কমলা চাষ হয়েছে। যেখান থেকে অন্তত ৩৯০ টন কমলা উৎপাদন হয়েছে। বিঘাপ্রতি উৎপাদন হয়েছে ১৫০ থেকে ১৭০ মণ। এসব কমলা বিক্রি হয়েছে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি দরে, যার আনুমানিক বাজার দাঁড়ায় প্রায় ৫৩ কোটি টাকা। চুয়াডাঙ্গার চার উপজেলায় চায়না-৩, দার্জিলিং, সাউথ আফ্রিকাসহ বিভিন্ন জাতের সর্বমোট কমলা লেবুর চাষ হয়েছে ৭৮ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলায় ৫ হেক্টর, আলমডাঙ্গায় ১০ হেক্টর, দামুড়হুদায় ১১ হেক্টর ও জীবননগরের ৫২ হেক্টর জমিতে।
দামুড়হুদা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শারমিন আক্তার বলেন, জেলায় কমলা চাষে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে এই উপজেলায় ১১ হেক্টর জমিতে কমলা লেবুর চাষ হয়েছে। এ ফলের উৎপাদন বাড়াতে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়া হচ্ছে বলে জানান এই কর্মকর্তা। এই জেলার কমলা দেখিয়ে দেয় সঠিক প্রশিক্ষণ, ধৈর্য আর সাহস থাকলে কৃষি হতে পারে সম্মানজনক পেশা, বড় বিনিয়োগ। তরুণরা ঝুঁকি নিয়ে ফল-ফসলের আবাদে মনোনিবেশ করছেন, যা কৃষিতে ইতিবাচক দিক হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তরুণদের টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্প থেকে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। দেশে বর্তমানে যে কমলা চাষ হচ্ছে সেগুলোর চেয়ে চুয়াডাঙ্গার কমলা স্বাদে অনেক ভালো। আর আমদানি করা কমলার চেয়ে এর রংটাও আকর্ষণীয়। কমলা চাষে তুলনা মূলক কম খরচে বেশি মুনাফা অর্জন সম্ভব। প্রায় এক লাখ টাকা খরচে দুই বছরের মধ্যে তিন থেকে চার গুণ লাভ সম্ভব। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে মুনাফা বাড়ানোর জন্য চাষিদের উন্নত জাতের বিতরণ, জৈবসার ব্যবহারের প্রশিক্ষণ এবং ইরিগেশন প্রযুক্তি সরবরাহের উদ্যোগ নেওযা হয়েছে এক সময়ের আমদানি নির্ভর এই ফল এখন চুয়াডাঙ্গার সমতল মাটিতে ফলেছে বিপুল সম্ভাবনার বার্তা নিয়ে।
সারাদেশ: কলাপাড়ায় ট্রাকের চাপায় বাইকচালক নিহত