image
রাজশাহী : গ্রামীণ ঐতিহ্যের স্মৃতিময় ঢেঁকির ব্যবহার কিছুটা ধরে রেখেছে মোহনপুর উপজেলার ঘাসিগ্রাম -সংবাদ

মকরসংক্রান্তিতে বরেন্দ্রে জেগে ওঠে ঢেঁকির শব্দে শীতের ভোর

জেলা বার্তা পরিবেশক, রাজশাহী

শীত নামলেই বরেন্দ্রের মাটিতে যেন স্মৃতিরা জেগে ওঠে। কুয়াশা ভেজা ভোরে একসময় যে ঢেঁকির ধপাধপ শব্দে গ্রামের ঘুম ভাঙত, আজ তা কেবলই অতীতের ডাক তবু পিঠে-পুলির উৎসবে সেই ডাক আবার প্রাণ পায়। মকরসংক্রান্তিতে চালের গন্ধ, নতুন ধানের উষ্ণতা আর নারীদের মিলিত হাসিতে ঢেঁকি হয়ে ওঠে শুধু একটি যন্ত্র নয়, হয়ে ওঠে সময়ের সেতু যা বর্তমানকে জুড়ে দেয় সোনালি দিনগুলোর সঙ্গে। আধুনিকতার চাপে হারিয়ে যেতে বসা এই গ্রামীণ ঐতিহ্য আজও কিছু উঠোনে টিকে আছে আবেগে, স্বাদে আর সংস্কৃতির দায়ে। ঢেঁকির প্রতিটি আঘাতে ভাঙে চাল, আর জেগে ওঠে বরেন্দ্রের শিকড় যেখানে পিঠে-পুলি শুধু খাবার নয়, একটি স্মৃতির উৎসব।

বরেন্দ্র অঞ্চলের মোহনপুর উপজেলার বড়াইল গ্রামের বিশ্বাস বাড়ির উঠোনে ঢেঁকিতে চাল কুটছিলেন তারা। হাতে সময় কম। তাই ঢেঁকিতে ধপাধপ পাড় দিচ্ছিলেন। বিশ্বাস বাড়ির সালমা, যমুনা, ফাতেমা ও জাহানারাসহ আর নারীরা জানিয়েছেন শীত আসলেই গ্রামের মানুষদের কাছে পিঠাপুলি খাওয়ার অন্যরকম আনন্দ। আমরা পরিবারের জন্য বহুরূপী পিঠা বানানোর জন্য বাড়িতে রাখা ঢেঁকিতে আটা কুটি। মেশির কুটা চালের আটার তুলনায় ঢেঁকিতে কুটা আটার পিঠার স্বাদ অনেক বেশি। এ কারণের আমরা ঢেঁকির ব্যবহার এখনও ধরে রেখেছি।

উত্তারাঞ্চলের ভাতঘর বলে খ্যাত বরেন্দ্র অঞ্চলে কালের বিবর্তন আর আধুনিকতার ছোঁয়ায় ঢেঁকির ব্যবহার বিলুপ্তপ্রায়। পৌষে ও মাঘে গ্রামাঞ্চলের কৃষক পরিবারে চলতো পিঠা উৎসব। মকরসংক্রান্তিতে গ্রামীণ জীবনে ঢেঁকির শব্দে ভোরের ঘুম ভাঙতো গ্রামের মানুষের।

দিনগুলো এখনও ছবির মতো স্পষ্ট দেখতে পান রাজশাহী গোদাগাড়ী উপজেলার গ্রোগ্রাম গ্রামের সরলা দেবী। তখন তারও বয়স অল্প। তিনি বলেন, ‘মাঠের নতুন ধান উঠলেই প্রস্তুতি শুরু হত। ঢেঁকিতে নতুন চাল গুঁড়ো করা শুরু হলো মানেই মকর-পরব এসে গেল। তখন গ্রামে তিন দিন ধরে উৎসব হত। উৎসব পিঠে-পুলি তৈরি করে পাড়া-পড়শিদের মধ্যে বিলানো। তবে এখন বিশেষ বিশেষ সময়ে পিঠেপুলি গড়ার জন্যই একবার করে প্রাণ পায় ঢেঁকি। গ্রামের সরলা দেবীর মতো অনেকেই আছেন যারা ঢেঁকি ছাঁটা চাল ঢেঁকিতে গুঁড়ো করে গড়েন রকমারি পিঠে, পুলি, পাটিসাপটা, সরা পিঠে, সেদ্ধ পিঠে, ভাজা পিঠে বা গোকুল পিঠে।

আবার এই গ্রামের রাম সাহার বাড়িতে বছর দশেক হলো ঢেঁকির পাট উঠে গিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আটের দশক পর্যন্ত আমাদের মতো গ্রামাঞ্চলে রীতিমতো ঢেঁকির চল ছিল। তখন চাল কোটাই ছিল ঢেঁকির প্রধান ব্যবহার। তার সঙ্গে ডাল, চিঁড়ে কোটা। চালের গুঁড়ো সবই হত। তার পর লোকে চালের জন্য মিলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ল। তবে এসব কিছুর মধ্যে গ্রামীণ ঐতিহ্যের স্মৃতিময় ঢেঁকির ব্যবহার কিছুটা ধরে রেখেছে মোহনপুর উপজেলার ঘাসিগ্রাম ইউনিয়নের বেলনা, বড়াইল, মেলান্দি গ্রামের মানুষ। এখানে এখন পর্যন্ত সকাল হলেই অধিকাংশ বাড়িতেই পিঠা-পুলির আয়োজন দেখা যায়।

মোহনপুর উপজেলার কেশরহাট পৌর এলাকার হরিদাগাছি গ্রামের কৃষক আবদুস সালাম জানিয়েছেন, আগের দিনে আমাদের বাড়িতে ধান ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ঢেঁকিতে ধান ভানা, আটা কুটার রীতি ছিল। এ বয়সে এসে পিঠা খাওয়ার জন্য ঢেঁকিতে গুঁড়ো কোটার সমস্যায় শখের পিঠা ইচ্ছে করলেই খেতে পারছি না। ঢেঁকিতে ধান ভানার কারণে যে তুষ পাওয়া যেত, তা জ্বালানির কাজে ব্যবহার হতো। কিন্তু প্রতি দিনের জীবন থেকে ঢেঁকির ছুটি হয়ে গিয়েছে কবেই। বিশেষ করে চালকল আসার পর থেকে একেবারেই বিলুপ্তি হয়ে পড়েছে ঢেঁকি।

‘সারাদেশ’ : আরও খবর

» শেরপুর-সোনামুখী সড়কে আবারও ফিরল সিএনজি

সম্প্রতি