ঢাকায় রানা প্লাজা ট্রাজেডির পর নওগাঁ পৌর এলাকায় প্রায় অর্ধশত ভবন ঝুঁকিপূর্ণ ও পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হলেও দীর্ঘ ১২ বছরেও সেগুলো অপসারণ বা বন্ধে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এদিকে সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানের মতো নওগাঁতেও একাধিকবার ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। সর্বশেষ গত নভেম্বরে নওগাঁ পৌর কর্তৃপক্ষ পৌর এলাকায় ৪৩টি পুরাতন ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। এসব ভবনে এখনও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস ও ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন অনেক মানুষ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষিত এসব পুরাতন ভবনের বেশিরভাগই নওগাঁ শহরের জনবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত। এর মধ্যে রয়েছে নওগাঁ পৌরসভার মালিকানাধীন কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল, জেলা মাছ বাজারের পূর্ব অংশ, জেলা সমবায় অফিসারের কার্যালয়, পুরাতন হাসপাতাল রোডে অবস্থিত সাবেক রূপালী ব্যাংক ভবন, চকএনায়েত মহল্লার একটি প্রি-ক্যাডেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ডাবপট্টির বদীর বিল্ডিং ও চুড়িপট্টির ভবানী ভাণ্ডার।
এসব ভবনের নিচে ও আশপাশে প্রতিদিন হাজারো মানুষের চলাচল রয়েছে। কোথাও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কোথাও শিক্ষা কার্যক্রম, আবার কোথাও বসবাস চলছে। স্থানীয়দের ভাষায়, পরিত্যক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণার পরও জীবিকার তাগিদে বাধ্য হয়েই তাদের এসব ভবনে অবস্থান করতে হচ্ছে।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণার পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়ায় তারা প্রতিদিন আতঙ্ক নিয়ে বসবাস ও জীবিকা নির্বাহ করছেন।
চুড়িপট্টির ব্যবসায়ী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের দোকান যে ভবনে সেটি অনেক আগেই ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে কিন্তু দোকান বন্ধ করলে পরিবার চালাবো কীভাবে? প্রতিদিন ভয় নিয়েই দোকান খুলছি। হঠাৎ বড় ভূমিকম্প হলে আমরা বের হওয়ার সুযোগও পাবো না।’
ডাবপট্টি এলাকার গৃহবধু শিউলি বেগম বলেন, ‘এই ভবনের উপরের তলায় আমরা পরিবার নিয়ে থাকি। মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন দেয়ালে ফাটল ধরে। ভূমিকম্প হলে শিশুদের নিয়ে কোথায় যাব সেই চিন্তায় রাতে ঘুম হয় না।’
পুরাতন হাসপাতাল রোডের এক পথচারী আব্দুল মালেক বলেন, ‘এই রাস্তা দিয়েই প্রতিদিন হাসপাতালে যাতায়াত করতে হয়। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের পাশ দিয়ে হাঁটতে গেলে বুক ধড়ফড় করে, যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’
কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকার এক হেলপার শাহীন আলম বলেন, ‘বাস টার্মিনাল সবসময় মানুষে ভরা থাকে। ভবনগুলো এতো পুরাতন যে একটু নড়াচড়া হলেই ভেঙে পড়বে মনে হয়। দুর্ঘটনা হলে এখানে প্রাণহানি ঠেকানো যাবে না।’
মুক্তিরমোড় এলাকার নাসির উদ্দিন বলেন, ‘যে ভবনে বাচ্চারা পড়াশোনা করছে সেটাই ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায়। সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে ভয় লাগে কিন্তু বিকল্পও নেই।’
নওগাঁর স্থানীয় সামাজিক সংগঠন একুশে পরিষদের সভাপতি ডি এম আব্দুল বারী বলেন, ‘বর্তমানে যখন-তখন ভূমিকম্প হচ্ছে। বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে নওগাঁয় যে কোনো মুহূর্তে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ ও পরিত্যক্ত ঘোষিত ভবনগুলো দ্রুত অপসারণ করা জরুরি।’
গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক কর্মী কায়েস উদ্দিন বলেন, ‘রানা প্লাজা ট্রাজেডির পর নওগাঁয় ঝুঁকিপূর্ণ যেসব ভবন ও মার্কেট চিহ্নিত করা হয়েছিল সেগুলো ১২ বছরেও অপসারণ করা হয়নি। ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হলে শহরের অপ্রশস্ত সড়ক ও ফায়ার সার্ভিসের আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে উদ্ধার কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।’
এ বিষয়ে নওগাঁ পৌরসভার প্রশাসক টি এম এ মমিন বলেন, ‘পৌর এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ও মার্কেটগুলোর তালিকা প্রস্তুত করে জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়েছে। সরকারি অনুমোদন পেলেই দ্রুত সরকারি মালিকানাধীন ভবনগুলো অপসারণ করা হবে।’
পরিত্যক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষিত ভবনগুলো নওগাঁ শহরের প্রাণকেন্দ্র বাজার এলাকা, চুড়িপট্টি, ডাবপট্টি, গাঁজাগোলা, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকায়। জনবহুল সড়কের ধারে অবস্থিত এসব ভবন একেকটি ‘মরণফাঁদে’ পরিণত হয়েছে। সম্ভাব্য দুর্ঘটনায় জানমাল রক্ষায় দ্রুত সময়ের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো অপসারণের জোর দাবি জানিয়েছেন নওগাঁর সচেতন মহল।