image
ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

কুয়াশার চাদর ভেদ করে গাছিদের কর্মযজ্ঞ রসের হাঁড়িতে জমছে শীতের স্বাদ

প্রতিনিধি, গাইবান্ধা

শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতিতে এখন হিমেল হাওয়ার দাপট। কুয়াশার চাদরে ঢাকা ভোর কিংবা পড়ন্ত বিকেলের সোনালী রোদে গ্রাম-বাংলার মেঠো পথে এখন চোখে পড়ছে চিরচেনা এক দৃশ্য। কোমরে রশি বেঁধে নিপুণ হাতে তরতর করে খেজুর গাছে উঠছেন গাছিরা। উদ্দেশ্য একটাই - শীতের ঐতিহ্যবাহী সুস্বাদু খেজুরের রস সংগ্রহ।

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ, পলাশবাড়ি, সাদুল্যাপুর, সদর, সুন্দরগঞ্জ ও সাঘাটা উপজেলার প্রতিটি জনপদ ও সড়কের পাশে এখন চলছে খেজুর গাছ প্রস্তুত করার ধুম। দক্ষ হাতে গাছের আগা পরিষ্কার করে, কোমরে বাঁধা রশি আর মাটির হাঁড়ি নিয়ে গাছিরা প্রস্তত রস আহরণের শেষ ধাপে।

গাছিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সুমিষ্ট ও মানসম্মত রস পাওয়ার জন্য গাছকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় প্রস্তত করতে হয়। প্রথমে গাছের মরা ডালপালা ও ছাল পরিষ্কার করা হয়, স্থানীয় ভাষায় যাকে বলা হয় ‘গাছ ঝুড়া’। এরপর বিশেষ কায়দাতে গাছের উপরিভাগের নরম অংশ কেটে নল বসানো হয়, যাতে ফোঁটায় ফোঁটায় রস চুইয়ে হাঁড়িতে জমা হতে পারে।

এ বিষয়ে গাছি আনিছুর রহমান বলেন, “খেজুরের রসের চাহিদা প্রচুর, তাই রস সংগ্রহের ক্ষেত্রে আমাদের বাড়তি যত্ন নিতে হয়। একেকটি গাছ থেকে রস বের করতে দিনের পর দিন পরিশ্রম করতে হয়।”

অন্যদিকে, রসের নিরাপত্তা ও মান বজায় রাখতে সতর্ক গোবিন্দগঞ্জের কাটা গ্রামের সোবাহান আলী। তিনি জানান, “রসে যাতে কোনো পশুপাখি মুখ দিতে না পারে, সেজন্য আমরা বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছি। এ বছর শীতের তীব্রতা বেশি থাকায় রসের মান ও পরিমাণ-দুটোই বেশ ভালো।”

শীত মানেই বাঙালির ঘরে ঘরে পিঠা উৎসব। আর খেজুরের রস ছাড়া সেই উৎসব যেন মলিন। গাইবান্ধা সদর উপজেলার মাস্টারপাড়া গ্রামের দিপালী রানী বর্মন বলেন, “শীতের সকালে খেজুরের রস, আর সেই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি গুড়-পাটালি ছাড়া বাঙালির শীতকাল ভাবাই যায় না। ভাপা, চিতই কিংবা নানা পদের পিঠা-পুলি তৈরিতে এই রসের কোনো জুড়ি নেই। তাই শীত এলেই গাছিদের কদর বেড়ে যায় বহুগুণ।”

তবে শঙ্কার বিষয় হলো, আধুনিকতা ও নগরায়নের প্রভাবে অনেক এলাকায় খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে খেজুর গাছের অবাধ ব্যবহারের ফলে এই ঐতিহ্য আজ কিছুটা হুমকির মুখে। তবুও, প্রতিতকূলতা উপক্ষে করে গাছিদের মতো পরিশ্রমী মানুষেরা আজও টিকিয়ে রেখেছেন বাংলার এই হাজার বছরের ঐতিহ্য। তাদের হাত ধরেই বাঙালির ঘরে ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে শীতের প্রকৃত স্বাদ।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার প্রচুর রস পাওয়া যাবে এবং জমে উঠবে গ্রাম-বাংলার নবান্ন ও পিঠা উৎসব।

‘সারাদেশ’ : আরও খবর

সম্প্রতি