image

ডিমলায় উপেক্ষিত আইন-কানুন, নিষ্ক্রিয় প্রশাসন, চরম ঝুঁকিতে জনজীবন

প্রতিনিধি, ডিমলা (নীলফামারী)

নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় অনুমোদনহীন অবৈধ মিনি পেট্রোল পাম্পের বিস্তার এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। প্রশাসনের একাধিক অভিযান, জরিমানা ও সিলগালার পরও আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এসব ঝুঁকিপূর্ণ পাম্প আবারও চালু হচ্ছে পুরোদমে। ফলে পুরো উপজেলা কার্যত একটি জ্বলন্ত বারুদের স্তূপে পরিণত হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমানে ডিমলা উপজেলায় নতুন-পুরাতন মিলিয়ে অন্তত প্রায় ১০০টি অধিক অবৈধ মিনি পেট্রোল পাম্প সক্রিয় রয়েছে। অথচ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় বৈধ ফিলিং স্টেশন রয়েছে মাত্র চারটি—উপজেলা সদরে দুটি এবং খালিশা চাপানি ও ঝুনাগাছ চাপানি ইউনিয়নে একটি করে।

দৈনিক সংবাদের একাধিক সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশের পর উপজেলা প্রশাসন কিছু পাম্পে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা ও সিলগালা করলেও অজ্ঞাত কারণে সেগুলো আবারও চালু হয়ে যায়। প্রশাসনের এমন দুর্বল অবস্থানের সুযোগে আগে যেখানে প্রায় ৭০টি অবৈধ পাম্প ছিল, সেখানে এখন সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০৫ টি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, এসব মিনি পাম্প স্থাপন করা হয়েছে বাজার, স্কুল, আবাসিক ভবন ও ব্যস্ত সড়কের একেবারে পাশে। কোথাও টিনশেড ঘর, কোথাও মুদি দোকানের ভেতর রাখা হয়েছে ডিজেল-পেট্রোলের ড্রাম। নেই কোনো অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, নেই বালির বস্তা, নেই নিরাপদ দূরত্ব আইনের ন্যূনতম শর্তও মানা হচ্ছে না।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, একটি সিগারেটের আগুনই পুরো এলাকা ধ্বংস করে দিতে পারে। ইতিপূর্বে ডিমলা সদর ইউনিয়নের বাবুরহাট বাজারসংলগ্ন টিএনটি সড়কে অবস্থিত অনুমোদনহীন ‘মেসার্স বক্কর অ্যান্ড সন্স’ নামক একটি মিনি পাম্পে ভয়াবহ অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে।

এতে এক কর্মচারী দগ্ধ হন, পুড়ে যায় আশপাশের দোকানঘর, একটি মোটরসাইকেল শোরুমসহ বিভিন্ন স্থাপনা। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় এক কোটি টাকা। বিস্ফোরণের শব্দে পুরো বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সিলগালা করা হলেও সেই পাম্পসহ আশপাশের অবৈধ পাম্পগুলো গড়ে তুলে আবারও চালু করা হয়েছে মহা সমারোহে।

মোটরসাইকেল আরোহীরা জানান, এসব পাম্পে বিক্রি হওয়া তেলে ময়লা ও ভেজাল মেশানো থাকে। পরিমাপেও তেল কম দেওয়া হয়। ফলে যানবাহনের ইঞ্জিন দ্রুত নষ্ট হচ্ছে, বাড়ছে আর্থিক ক্ষতি।

এছাড়া এসব পাম্প থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে।

১৯৩৪ সালের পেট্রোলিয়াম অ্যাক্ট ও ১৯৩৭ সালের পেট্রোলিয়াম বিধিমালা অনুযায়ী জ্বালানি তেল সংরক্ষণ ও বিক্রয়ের জন্য বিস্ফোরক পরিদপ্তরের অনুমোদন, অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা ও পরিবেশগত ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক। কিন্তু ডিমলার অবৈধ পাম্পগুলোর বেশিরভাগই শুধু একটি ট্রেড লাইসেন্স কিংবা স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় পরিচালিত হচ্ছে যা সম্পূর্ণ বেআইনি।

বাবুরহাটের ব্যবসায়ী আলতাব হোসেন বলেন, প্রতিদিন বিস্ফোরণের ভয়ে দোকান করি। মাঝে মাঝে অভিযান হয়, কিন্তু কিছুদিন পর আবার আগের মতোই চলে। এটা অভিযান নয়, লোক দেখানো।

ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমরানুজ্জামান বলেন, অবৈধ মিনি পাম্প চিহ্নিত করে কয়েকটিতে অভিযান চালিয়ে জরিমানা ও সিলগালা করা হয়েছে। খুব দ্রুত আবারও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। সিলগালা করা পাম্প চালু করলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জনগণের নিরাপত্তাই আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু আইনের লঙ্ঘন নয়—ডিমলার জন্য একটি সময়বোমা। বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, সমন্বিত ও টেকসই পরিকল্পনার মাধ্যমে অবৈধ মিনি পেট্রোল পাম্প স্থায়ীভাবে বন্ধ না করলে যেকোনো সময় বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটতে পারে।

জননিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষায় এখনই কঠোর সিদ্ধান্ত না নিলে ডিমলার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে এমনটাই মনে করছেন সচেতন মহল।

‘সারাদেশ’ : আরও খবর

সম্প্রতি