image
গাইবান্ধা : ব্রহ্মপুত্র নদীর বালুচর পার হয়ে স্কুলে যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা -সংবাদ

চরাঞ্চলে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ শুধুই মরীচিকা নানা প্রতিকূলতায় প্রাথমিকেই ঝরে পড়ছে হাজারো স্বপ্ন

আফতাব হোসেন, গাইবান্ধা

রংপুর বিভাগের গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও রংপুর জেলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে শিক্ষার আলো পৌঁছানোই যেখানে বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে উচ্চ শিক্ষা বা কলেজের স্বপ্ন দেখা চরের শিক্ষার্থীদের জন্য বিলাসিতা ছাড়া আর কিছু নয়। ভৌগোলিক প্রতিকূলতা, নদীভাঙন এবং দারিদ্র্যের কশাঘাতে প্রাথমিকেই ঝরে পড়ছে হাজার হাজার শিশু। আর যারাও বা প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের গন্ডি পেরোতে সক্ষম হয়, তাদের জন্য চরাঞ্চলে নেই কোনো কলেজ বা উচ্চ শিক্ষার সুযোগ। ফলে অকালেই ঝরে যাচ্ছে অসংখ্য সম্ভাবনাময় প্রাণ।

প্রাথমিকেই বড় ধাক্কা তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীবেষ্টিত ১৮টি উপজেলার চরাঞ্চলে প্রায় ২৩ লাখ মানুষের বসবাস। এখানে শিক্ষার ভিত্তি বা প্রাথমিক স্তরেই রয়েছে বড় ধস। বেসরকারি সংস্থা ‘গণউন্নয়ন কেন্দ্র’ (জিইউকে)-এর তথ্যানুযায়ী, উত্তরাঞ্চলের ৪১৬টি চরের মোট জনসংখ্যার ৩৬ শতাংশই শিশু। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার শিশু স্কুলে যাওয়ার সুযোগই পায় না। আর যারা ভর্তি হয়, তাদের বড় একটি অংশ পঞ্চম শ্রেণি শেষ করার আগেই ঝরে পড়ে।

জাতীয় পর্যায়ে যেখানে প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার ১৫ শতাংশ, সেখানে চরাঞ্চলে এই হার দিগুণেরও বেশি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০২১ সালের রিপোর্টেই ঝরে পড়ার হার ১৮-২০ শতাংশ বলা হলেও, চরের বাস্তবতায় তা আরও ভয়াবহ। বেসরকারি সংস্থার জরিপে দেখা গেছে, চরাঞ্চলের অন্তত ৪০ শতাংশ শিশুই শিক্ষা থেকে বঞ্চিত।

নেই কলেজ, থমকে যায় উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন চরাঞ্চলে প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে কিছুটা সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ থাকলেও, উচ্চ শিক্ষা বা কলেজ পর্যায়ে উদ্যোগ প্রায় শূন্যের কোঠায়। চরের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর জন্য স্থানীয়ভাবে কোনো কলেজ গড়ে ওঠেনি। গবেষকদের চিহ্নিত শিক্ষায় পিছিয়ে পড়ার ৫টি মূল কারণের মধ্যে ‘উচ্চ শিক্ষার সুযোগ না থাকা’ অন্যতম।

সাঘাটার উদয়ন মহিলা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা শাহাদৎ হোসেন মন্ডল ও স্থানীয় শিক্ষাবিদদের মতে, চরের ছেলে-মেয়েরা প্রাথমিক বা মাধ্যমিক কষ্ট করে শেষ করলেও কলেজের জন্য তাদের মেইনল্যান্ডে বা জেলা সদরে যেতে হয়। কিন্তু নদী পার হয়ে প্রতিদিন শহরে গিয়ে ক্লাস করা অনেকের পক্ষেই অসম্ভব। বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে এই সংকট তীব্র। যাতায়াত সমস্যা ও নিরাপত্তার অজুহাতে অনেক অভিভাবক মেয়েদের দূরে কলেজে পাঠাতে চান না, ফলে বেড়ে যায় বাল্যবিয়ের প্রবণতা।

ভৌগোলিক ও কাঠামোগত অন্তরায় গাইবান্ধা সদর উপজেলার মোল্লাচর ইউপি চেয়ারম্যান সাইদুজ্জামান জানান, একটি চরের স্থায়িত্ব হয় ১০ থেকে ১৫ বছর। একবার ভাঙলে তা আবার জাগতে সময় লাগে ৭-৮ বছর। এই অনিশ্চিত জনপদে স্কুলই যেখানে টেকে না, সেখানে কলেজ বা বড় অবকাঠামো গড়ে তোলা কঠিন। ফুলছড়ির উজালডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি যেমন নদীভাঙনের কবলে পড়ে চলতি বছর স্থানান্তরিত হচ্ছে, তেমনি শত শত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

শিক্ষাবিদ জহুরুল কাইয়ুম বলেন, চরের প্রেক্ষাপট বিবেচনা না করে সমতলের ন্যায় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করায় চরের মানুষ পিছিয়ে পড়ছে।” শিক্ষকরা মূলত মূল ভূখন্ডে থাকেন, নদী পার হয়ে স্কুলে যেতেই তাদের অনেকটা সময় চলে যায়, ফলে পাঠদান ব্যাহত হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আউট অব স্কুল চিলড্রেন কর্মসূচির মতো প্রকল্পগুলো চরাঞ্চলে খুব একটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। গাইবান্ধার শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মাজহার উল মান্নান এধরণের প্রকল্পকে ‘শেয়ালকে ছাগলের বাচ্চা দেখানো’র সাথে তুলনা করেছেন।

এই সংকট নিরসনে এবং চরাঞ্চলে উচ্চ শিক্ষার পথ সুগম করতে বেশ কিছু সুপারিশ উঠে এসেছে: ১. চরাঞ্চলের বাস্তবতা অনুযায়ী অঞ্চলভিত্তিক স্বতন্ত্র শিক্ষানীতি ও বাজেট প্রণয়ন। ২. স্থানীয় শিক্ষিতদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ ও বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করা। ৩. চরের ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় ভাসমান স্কুল ও কলেজ বা ‘বোট স্কুল’ কার্যক্রম চালু করা। ৪. উপবৃত্তি, স্কুল মিল এবং যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ করা।

চর গবেষক ও গণউন্নয়ন কেন্দ্রের নির্বাহী প্রধান এম. আবদুস্ সালাম জানান, চরের শিশুরা প্রাথমিক, মাধ্যমিক শিক্ষা থেকেই বঞ্চিত. আর কলেজে পড়ার সুযোগ তো পরের কথা। তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন চরের উন্নয়নে পৃথক পলিসি ও বোর্ড গঠন করতে হবে।

রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব হলো প্রতিটি শিশুর শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা। চরাঞ্চলের লাখো শিক্ষার্থীকে যদি উচ্চ শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত রাখা হয়, তবে দেশের সার্বিক উন্নয়ন সূচক অর্জন কখনোই সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা।

‘সারাদেশ’ : আরও খবর

সম্প্রতি