পৌষের বিদায়ে মাঘের প্রথম প্রভাতে গাজীপুরের কালীগঞ্জ যেন নতুন করে জেগে ওঠে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই দিনে বিনিরাইল গ্রামে বসে এক অনন্য মাছের মেলা- যা স্থানীয়দের কাছে শুধু মাছের বাজার নয়, বরং সম্পর্কের, রেওয়াজের আর আনন্দের মিলনমেলা। আড়াইশ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এই আয়োজন আজ পরিচিত জামাই মেলা নামে।
বুধবার, (১৪ জানুয়ারী ২০২৬) ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই বিনিরাইল ও আশপাশের মাঠজুড়ে জমে ওঠে মানুষের স্রোত। দিনভর থেকে রাত পর্যন্ত চলা এই মেলায় লাখো মানুষের পদচারণা। বাহারি মাছের সারি, হাসি-আড্ডা আর উৎসবের আমেজে গ্রামটি পরিণত হয় এক রঙিন জনপদে এই মেলার বিশেষত্ব অন্য কোথাও নেই। এখানে ক্রেতার বড় অংশই জামাইরা। শ্বশুরবাড়ির দাওয়াত পেয়ে দূর-দূরান্ত থেকে তারা আসেন বড় মাছ কিনতে। আবার শ্বশুররাও কম যান না- জামাই আপ্যায়নে সেরা মাছ বেছে নিতে হাজির হন মেলাতেই। ফলে চোখে না বলা এক প্রতিযোগিতা চলে- কার ঝুলিতে উঠবে সবচেয়ে বড় মাছ!
বিনিরাইল গ্রামের সংলগ্ন ফসলি মাঠে প্রায় দুই শতাধিক মাছ ব্যবসায়ী পসরা সাজান। সামুদ্রিক ও নদীর বিশালাকৃতির মাছের সমাহার নজর কাড়ে সবার। চিতল, বাঘাইড়, আইড়, বোয়াল, কালী বাউশ, পাবদা, গুলসা, গলদা চিংড়ি, বাইম, ইলিশ-দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির মাছের পাশাপাশি থাকে রূপচাঁদা, পাখি মাছসহ আরও অনেক কিছু। মাছের সঙ্গে সঙ্গে মেলায় যোগ হয় মিষ্টি, খেলনা, আসবাব, ফলমূল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকান।
দিনভর মেলা ঘিরে থাকে উৎসবের উচ্ছ্বাস। শিশুদের জন্য বিনোদনের আয়োজন, খাবারের দোকানে ভিড়, আর আত্মীয়-স্বজনের মিলনে পুরো এলাকাজুড়ে তৈরি হয় আনন্দঘন পরিবেশ। স্থানীয়দের কাছে এই একটি দিনের অপেক্ষা যেন পুরো বছরের অপেক্ষা।
ইতিহাস বলছে, পৌষ-সংক্রান্তি উপলক্ষে অষ্টাদশ শতকে সনাদনীরা এই মেলার সূচনা করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মাছের মেলা থেকে এটি রূপ নেয় সামাজিক উৎসবে। শ্বশুররা মেয়ের জামাইকে দাওয়াত দেন, মেয়েরা স্বামী-সন্তান নিয়ে বাবার বাড়ি ফেরেন- এই রেওয়াজেই জামাই মেলা নামটি স্থায়ী হয়ে যায়। ধর্মীয় সীমা পেরিয়ে আজ এটি সর্বজনীন এক মিলনক্ষেত্র।
কালীগঞ্জ পৌর এলাকা থেকে আসা স্থানীয় চুপাইর গ্রামের জামাই মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম বলেন, এই মেলা শুধু কেনাবেচা নয়, সম্পর্কের টান। বহু বছর ধরে নিয়ম করেই এখানে আসি। এখন এটি সবার উৎসব।
মেলায় ঘুরতে আসা শহিদুল সরকার জানান, বন্ধুর শ্বশুরবাড়ির নিমন্ত্রণে এসে মেলাটি দেখার সুযোগ হলো। নিজের জন্যও এবং বন্ধুর শ্বশুর বাড়ির জন্য কিছু মাছ কিনলাম।
মাছ ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ইতিহাস আর ঐতিহ্যের টানেই এখানে মানুষের ভিড় বাড়ছে। বেচাকেনার পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়াই তাদের বড় প্রাপ্তি।
আয়োজক কমিটির সভাপতি মাওলানা আলী হোসেন বলেন, ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু হওয়া এই মেলা আজ আমাদের গর্ব। সময়ের সঙ্গে এটি একটি সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে।
কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. জাকির হোসেন জানান, ঐতিহ্যবাহী বিনিরাইলের মাছের মেলাকে কেন্দ্র করে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে থানা-পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও মেলা প্রাঙ্গণে সার্বক্ষণিক নজরদারি ও মনিটরিং করবেন।
কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ.টি.এম. কামরুল ইসলাম বলেন, বিনিরাইলের মাছের মেলা স্থানীয় ঐতিহ্যের প্রতীক। এমন আয়োজন আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতিকে জীবন্ত রাখে।
পৌষের শেষ আর মাঘের শুরুতে বিনিরাইল তাই শুধু একটি গ্রাম নয়-এটি হয়ে ওঠে স্মৃতি, সম্পর্ক আর সংস্কৃতির এক প্রাণবন্ত ঠিকানা।
অর্থ-বাণিজ্য: সূচক বাড়লেও কমেছে লেনদেন
অর্থ-বাণিজ্য: কেএফসি’র মেন্যুতে নতুন সংযোজন: বক্স মাস্টার
অর্থ-বাণিজ্য: রপ্তানিতে নগদ সহায়তা আরও ছয় মাস একই থাকছে
অর্থ-বাণিজ্য: সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট লাইসেন্সিং বিধিমালা ২০২৬ জারি
অর্থ-বাণিজ্য: আইপিওতে লটারি ব্যবস্থা আবারও ফিরছে