image

পলাশে কালের বিবর্তনে পানের বরজ বিলুপ্তির পথে

প্রতিনিধি, পলাশ (নরসিংদী)

ভোজন রসিক বাঙালির ভোজন শেষে মুখে এক খিলি পান খাওয়া। এ যেন ভোজনের তৃপ্তি ও অতৃপ্তিকর অবস্থার একটি ঐতিহ্য। আবহমান কাল ধরে বাঙালির মুখে পান, আঙ্গুলে চুন আর ঠোঁট রাঙানো একটা চিরন্তন প্রথা। বাংলাদেশের অধিকাংশ বাড়িতে রয়েছে পানদানী। বাড়িতে মেহমান আসলে, বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠরা খাবার পর পান খাবে, বিয়ের জন্য কণে দেখতে আসলে পানের পশরা সাঁজিয়ে কণে দেখানো। আবার কোন প্রীতিভোজ শেষে টেবিলে পানের পরিপাটি পানের থালা রাখা। এ যেন বাঙালী সংস্কৃতির এক যুগযুগান্তরের ঐতিহ্য।

প্রসঙ্গত বাংলাদেশের প্রায়ই সব জেলাতেই কম বেশি পান চাষ হয়। সেজন্য পান প্রিয় মানুষদের জন্য হাটে বাজারে রাস্তার মোড়ে বা হোটেলের পাশে দেখা যায় হাজার হাজার পান সিগারেটের দোকান। শুধু পান বিক্রি করেই চলছে দেশে অসংখ্য পরিবার। পান দোকানিরা আবার সখ করে পানের নাম দিয়েছে আনারকলি, হিমকবরি পান, মিষ্টি পান, রাজকুমারী পান, চায়না পান। নাম ভেদে দামও ৫ টাকা হতে ৫০ টাকা। এতে বিক্রিও কিন্তু কমনা।

পান একপ্রকার লতা জাতিয় গাছ।লতার মতো কোন অবলম্বন পেলেই উপরে উঠে। আর চারিদিকে ছড়িয়ে দেয় পানপাতা। পান একটি অর্থকরী পাতা। পান চাষ যেমন ব্যয়বহুল তেমনি পরিশ্রম। ফলশ্রুতিতে দেশের অন্যন্য স্থানের মতো পানের জন্য বিখ্যাত পলাশ উপজেলায় পানের বরজ এখন বিলুপ্তির পথে। কালের বিবর্তনে যে পলাশে আশির দশকেও ছিল কয়েকশ পানের বরজ। এখন হাতেগোনা সারা উপজেলায় রয়েছে মাত্র ১০টি পানের বরজ। পলাশের পাইকসা, ঘোড়াশাল, দীগদা, সান্তানপাড়া, ভিরিন্দা, চরসিন্দুর, মালিতা, লোহারকান্দা, বালিয়া, কাউয়াদি, সুলতানপুর গ্রামগুলোতে মাত্র চার দশক আগেও রাস্তার পাশে, বাড়ির পাশে পানের বরজ ছিল। এসব পরিবারের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র পথ ছিল পান বিক্রি করা। শুধুই পলাশে নয়। পলাশের স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে পান যেত ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায়।

চরসিন্দুরের রজত দাস জানায় আমাদের বর্তমানে ছোট একটি পানের বরজ আছে। ছোটবেলায় দেখতাম আমাদের গ্রামসহ আশেপাশের গ্রাম হতে প্রতিদিনই ঠুকরি মাথায় পান নিয়ে বাজারে যেত লোকজন। এখন মানুষ ঘরে ঘরে চাকরি করে, অনেকে বিদেশে কাজ করে। পান চাষে উৎসাহ এখন আগের মত নেই। পলাশ-ঘোড়াশাল শিল্পাঞ্চলের শতাধিক কারখানায় বহু লোকজন করছে চাকুরি। কেউবা করছে ব্যবসা। পানের বরজের জায়গায় বাড়ি করে দিয়েছে দোকান বা লোকজন থাকার ভাড়া। তাছাড়া পান চাষ বেশ জটিল ও ব্যয়বহুল। সময়মতো রোপণ, সার প্রয়োগ, সেচ দেয়া ও নিয়মিত যতœ না করলে পানের ফলন হয় না।

ভিরিন্দা গ্রামে শান্তুনু মাস্টার, মুকুল মাস্টার, শংকর মিত্র ও রঞ্জন দাসের একটি করে পানের বরজ আছে। তাদের বক্তব্য পলাশে আশির দশক হতে দ্রুত ক্রমবর্ধমান শিল্পায়ন, জনবসতি গড়ে ওঠা, বাজারের সংখ্যা বৃদ্ধি ও অনেকে পানের বরজের জমি বিক্রি করে বাসাবাড়ি তৈরি করে ভাড়া দেয়াই হলো পনের বরজের সংখ্যা কমে যাওয়া। তদোপরি বরজ পরিচর্যাকারী লোকজন এখন পাওয়াই যায়না।

পুষ্টিবিদ ডা. আনিসুর রহমান বলেন, পান পাতা হজমশক্তি বাড়াতে, পেটের গ্যাস কমাতে, শ্বাসকষ্ট দূর করতে, অ্যান্টিঅক্সিপেন্ট বাড়াতে ও ত্বকের তারুণ্য ধরে রাখতে সাহায্য করে। তাছাড়া সর্দিকাশি, ব্রঙ্কাইটিস, হাঁপানি ও কন্ঠের শ্লেষ্মা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।পানে রয়েছে ভিটামিন সি, এ, আয়রন, ক্যালশিয়ামÑ যা মানবদেহের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি ক্যানসারের ঝুঁকিও কমায় পান। তবে পানের সাথে সুপারি খর জর্দা বা চুন মিশিয়ে খেলে হিতে বিপরীতটা হয়। লবঙ্গ, মৌরি গোলমরিচ বা ধনেসহ পান মধু দিয়ে খেলে খুবই উপকার। কিন্তু সিংহভাগ মানুষই পানের সাথে চুন খর জর্দা সুপারি খায়।

এতে মুখে কণ্ঠে পাকস্থলীতে ক্যানসারের সম্ভাবনা থাকে। দাঁতে স্থায়ী কাল দাগ পড়ে এনামেলের ক্ষতি হয়।

এদিকে পানের ব্যপক চাহিদা থাকায় ঘোড়াশালে গড়ে উঠেছে তিনটি পানের আড়ত। আড়তদাররা রাজশাহীসহ উত্তরবঙ্গ হতে পান ছড়িয়ে দিচ্ছে পলাশ নরসিংদীসহ আশপাশের জেলায়।

‘সারাদেশ’ : আরও খবর

সম্প্রতি