লামায় তামাক চাষের বিস্তার, হুমকির মুখে বন ও পরিবেশ

প্রতিনিধি, বান্দরবান (লামা)

লামা উপজেলায় চলতি মৌসুমে ব্যাপক হারে তামাক চাষের কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

বান্দরবানের লামা উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা এলাকার বিভিন্ন স্থানে পুঁজিবাদী ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ, জাপান টোব্যাকো, আবুল খায়ের, আকিজসহ মোট ৮টি তামাক কোম্পানি প্রায় ৭ হাজার ৩২০ একর ফসলি জমিতে তামাক চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্যে কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যে তাদের রেজিস্ট্রেশনভুক্ত প্রায় সাড়ে ৩ হাজার চাষিকে প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসেবে বীজ, পলিথিন, কীটনাশক, সার ও ঋণ প্রদান করেছে।

তামাক চাষের জন্য গত দুই মাস আগেই কৃষকরা বীজতলা প্রস্তুত করেন। পাশাপাশি ফসলি জমি, স্কুল মাঠের আশপাশ, মাতামুহুরী নদীর চর ও দুই তীরসহ বিভিন্ন স্থানে জমি প্রস্তুত করে তামাকের চারা রোপণ করছেন চাষিরা। যদিও নদী, খাল ও ঝিরির তলদেশ থেকে ৬০ ফুটের মধ্যে তামাক চাষ না করার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, সরকারের কৃষি বিভাগ তামাক চাষে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করলেও তামাক কোম্পানিগুলো উল্টো কৃষকদের তামাক চাষে উৎসাহিত করছে। ফলে উপজেলায় তামাক চাষ বৃদ্ধি পেলে জমির উর্বরতা নষ্ট, কৃষকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি, পরিবেশের ক্ষতি এবং খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন চিকিৎসক ও পরিবেশবিদরা।

কৃষি অফিসের তথ্যানুযায়ী, চলতি মৌসুমে ৮টি তামাক কোম্পানি লামা উপজেলার ১ হাজার ৫৭৭ একর জমিতে তামাক চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, কৃষি অফিসের এই পরিসংখ্যান সঠিক নয়; বাস্তবে প্রায় সাত গুণ বেশি জমিতে তামাক চাষ হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কোম্পানিগুলো মোট ৭ হাজার ৩২০ একর জমিতে তামাক চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। যদিও কৌশলগত কারণে তারা তাদের রেজিস্ট্রেশনকৃত চাষির সংখ্যা ও জমির পরিমাণ প্রকাশ করছে না। এমনকি তামাক চাষসংক্রান্ত কোনো তথ্য কৃষি অফিসকেও প্রদান করা হয় না।

পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় দেশের অন্যান্য জেলা ও উপজেলার তুলনায় লামা উপজেলায় ফসলি জমির পরিমাণ কম। অথচ চলতি মৌসুমে বিভিন্ন কোম্পানি ব্যাপক আকারে তামাক চাষের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর মধ্যেÑ আবুল খায়ের টোব্যাকো ৫৭০ জন চাষির মাধ্যমে ১,১৭০ একর, নাসির টোব্যাকো ২০০ জন চাষির মাধ্যমে ৩৫০ একর, জাপান টোব্যাকো প্রায় ৭৮২ জন চাষির মাধ্যমে ১৭০০ একর, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ ১০১২ জন চাষির মাধ্যমে কমপক্ষে ২০০০ একর, ভারগো টোব্যাকো ১৩০ জন চাষির মাধ্যমে ২২০ একর, গ্লোবাল টোব্যাকো কোম্পানি ১৫০ জন চাষির মাধ্যমে ৩০০ একর, বেঙ্গল টোব্যাকো কোম্পানি ১১৫ জন চাষির মাধ্যমে ২৮০ একর এবং আকিজ টোব্যাকো কোম্পানি ৩১২ জন চাষির মাধ্যমে ৯৫০ একর জমিতে তামাক চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

এছাড়াও রেজিস্ট্রেশনবহির্ভূত দুই শতাধিক চাষি এবার আরও ৩৫০ একর জমিতে তামাক চাষ করতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে তামাক কোম্পানিগুলোর দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মন্তব্য জানতে চাইলে তারা কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

লামা পৌরসভার সাবেক বিলছড়ি, ছাগলখাইয়া, হরিণঝিরি, কলিঙ্গাবিল, সদর ইউনিয়নের মেরাখোলা, মাতামুহুরী নদীর রাজবাড়ী পয়েন্ট এবং গজালিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে বাড়ির আঙিনা থেকে শুরু করে সর্বত্রই তামাকের বীজতলা তৈরি করা হয়েছে। বীজতলায় উৎপাদিত চারা এক মাস ধরে জমিতে রোপণ করছেন চাষিরা। এর আগে তামাক কোম্পানিগুলো এসব চাষিকে অর্থ, সার, বীজ, পলিথিন ও কীটনাশকসহ বিভিন্ন সুবিধা প্রদান করেছে।

রেজিস্ট্রেশনভুক্ত তামাক চাষিরা মৌসুম শুরুর আগেই চড়া মূল্যে ফসলি জমি অগ্রিম লাগিয়ত নিয়ে নেয়। ফলে সবজি চাষিরা জমি সংকটে পড়ছেন বলে অভিযোগ করেছেন তারা।

লামা পৌরসভার হরিণঝিরি গ্রামের সবজি চাষি হায়দার আলী, শফিকুল ইসলাম, মহরম আলী ও শাহজাহান মিয়া জানান, তামাক চাষিদের অগ্রিম লাগিয়তের কারণে সবজি চাষের জন্য জমি পাওয়া যায় না। আর পাওয়া গেলেও অতিরিক্ত মূল্যের কারণে অনেক সময় জমি নেয়া সম্ভব হয় না। এতে করে উপজেলায় তামাক চাষের পরিমাণ দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে।

মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী এম রুহুল আমিন বলেন, তামাক চাষের ফলে কৃষক, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও মাটির উর্বরতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি রবি শস্য উৎপাদনে নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। শুরুতেই তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে খাদ্য নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়বে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. গোলাম মোস্তফা নাদিম জানান, তামাক চাষের কারণে কৃষকদের শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, ক্যান্সারসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

লামা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. সোহেল রানা বলেন, তামাক চাষ বন্ধে সরকারিভাবে সুনির্দিষ্ট কোনো আইন না থাকায় কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। তবে কৃষি বিভাগ তামাক চাষে কোনো সহযোগিতা করছে না। বরং কৃষকদের বিকল্প হিসেবে আখ, সবজি, বাদাম, ড্রাগন ফল, সূর্যমুখী, খেসারি ডাল, পেঁপে, ভুট্টা, তুলা ও সরিষাসহ বিভিন্ন ফসল চাষে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে এবং প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে।

এদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মঈন উদ্দিন জানান, মৌসুমের শুরুতে মাতামুহুরী নদী, লামা খালসহ বিভিন্ন ঝিরির ৬০ ফুটের মধ্যে তামাক চাষ না করার নির্দেশনা জারি করে তথ্য অফিসের মাধ্যমে মাইকিংসহ ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, প্রচারণার পরও কেউ নির্দেশনা অমান্য করলে অভিযান চালিয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

‘সারাদেশ’ : আরও খবর

» যশোরে ৭৪টি অবৈধ কাঠের চুল্লি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিলো প্রশাসন

» ময়মনসিংহে ৫ পুলিশকে কুপিয়ে ছিনতাই, আসামির বাবাসহ গ্রেপ্তার ৭

সম্প্রতি