তিস্তা নদী এখন আর শুধু একটি নদী নয়- এটি পরিণত হয়েছে পাথর খেকো সিন্ডিকেটের উন্মুক্ত লুটপাটের মাঠে। ইঞ্জিনচালিত নৌকার পর এবার নদীর বুকে বসানো হয়েছে শক্তিশালী ‘বোমা মেশিন’, যা দিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে নদীর তলদেশ থেকে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনের ‘জিরো টলারেট’ ঘোষণা ও বিজিবির কঠোর অবস্থানের অঙ্গীকারকে কার্যত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে প্রভাব খাটিয়ে নির্বিঘে্ন চলছে এই ভয়ংকর কর্মকাণ্ড। গতকাল বুধবার স্থানীয় সাংবাদিক মামুনার রশিদ সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে তোপের মুখে পড়েন পাথর উচ্চারণকারী চক্রের।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিস্তা নদী থেকে পাথর উত্তোলনে জিরো টলারেট নীতির ঘোষণা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে অবৈধ সিন্ডিকেটকে শক্ত হাতে দমনের অঙ্গীকার করেন রংপুর ব্যাটালিয়ন (৫১ বিজিবি)-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সেলিম আল দীন। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ঘোষণাকে তুচ্ছ করে পাথরখেকো চক্র আরও আধুনিক ও বিধ্বংসী কৌশলে নদী লুটে নেমেছে।
দৈনিক সংবাদে ধারাবাহিক সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশের পর টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের বার্নির ঘাট, সীমান্ত ফাঁড়ি এলাকা ও তেলির বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে একাধিকবার মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। অভিযানে বিপুল পরিমাণ অবৈধভাবে উত্তোলিত পাথর জব্দ করা হলেও বাস্তবে পাথর খেকোদের দৌরাত্ম্যে কোনো লাগাম টানা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট বছরের পর বছর ধরে তিস্তা নদী থেকে পাথর তুলে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। নির্বিচারে বালু ও পাথর উত্তোলনের কারণে প্রতি বছরই ভয়াবহ নদীভাঙন ও আকস্মিক বন্যার মুখে পড়ছে তিস্তা পাড়ের জনপদ। আবাদি জমি, বসতভিটা, স্কুল-মসজিদ- সবকিছু একের পর এক নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন নদীতীরের হাজারো মানুষ।
ইতিপূর্বে যৌথ অভিযানে পাথর উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত ইঞ্জিনচালিত নৌকা ধ্বংস এবং বিপুল পরিমাণ যন্ত্রাংশ জব্দ করা হয়। সর্বশেষ গত ১৯ নভেম্বর (বুধবার) বিকেলে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তিস্তা বিধৌত এলাকার টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের তেলির বাজার, তিস্তা বাজারসহ একাধিক স্থান থেকে নদী থেকে অবৈধভাবে উত্তোলিত পাথরের স্তূপ জব্দ করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরানুজ্জামান। অভিযানে সহায়তা করে রংপুর ব্যাটালিয়ন (৫১ বিজিবি), ডিমলা থানা পুলিশ ও আনসার-ভিডিপি সদস্যরা।
তবে এসব অভিযানের পরও থামেনি পাথর খেকো চক্র। বরং প্রশাসনের দুর্বল প্রয়োগ ও দৃশ্যমান শাস্তির অভাবকে পুঁজি করে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো- তিস্তা নদীর ডানতীর ভাঙন রোধ ও তীর সংরক্ষণে প্রতি বছর শত শত কোটি টাকা ব্যয় করছে ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড (পউবো)। অথচ একই সময়ে নদীর ভেতরেই চলছে অবাধ পাথর উত্তোলন, যা এসব প্রকল্পকে কার্যত আত্মঘাতী করে তুলছে। সম্প্রতি তিস্তার নতুন চ্যানেল সৃষ্টি হয়ে খালিশা চাপানি ইউনিয়নের ছোট খাতা সুপারিটরি গ্রামে শত শত একর আবাদি জমি নদীতে চলে গেছে- সৃষ্টি হয়েছে নতুন নদীপথ। গত বর্ষায় উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের মধ্যে ৬টিতে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দেয়। তিস্তা ব্যারাজ এলাকা, তিস্তা বাজার, তেলির বাজার, চরখড়িবাড়ি, বাইশপুকুর, কালিগঞ্জ ও ভেন্ডাবাড়িসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে শ্যালো ইঞ্জিনচালিত নৌকা ও লোহার যন্ত্র দিয়ে নদীর তলদেশে গভীর গর্ত করে পাথর উত্তোলন চলছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, গয়াবাড়ী এলাকার মৃত মোকাদ্দেস আলীর ছেলে মো, জাফর আলী খান (৩৫), আব্দুর রহমান খান (৪০) ও মৃত খলিলুর রহমানের ছেলে মো, আ. রহিম (৩০) নামে ব্যক্তি চক্র বোমা মেশিন বসিয়ে অবাধে পাথর তুলছে- যেখানে ঠিক পাশেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে ভাঙন রোধের কাজ চলমান। একে সরাসরি ‘আত্মঘাতী রাষ্ট্রীয় অপচয়’ বলে আখ্যায়িত করেছেন তিস্তা পাড়ের মানুষ। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরানুজ্জামান বলেন, তিস্তা নদী থেকে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইনে মামলা করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নেয়া হবে। কোনোভাবেই এই অবৈধ কর্মকাণ্ড বরদাশত করা হবে না।
তবে তিস্তা পাড়ের মানুষের প্রশ্ন আরও কঠিন- ঘোষণা, আশ্বাস আর অভিযান নয়- কবে সত্যিকার অর্থে বন্ধ হবে তিস্তার পাথর লুট?