শীতের সকালের কুয়াশা ভেদ করে যখন রোদের প্রথম ছোঁয়া নামে বরেন্দ্রর মাঠে, তখন রাজশাহীর দিগন্তজোড়া প্রান্তর রূপ নেয় হলুদের সমুদ্রে। সরিষার ফুলে ফুলে ভরে ওঠা সেই মাঠে হিমেল হাওয়ার সঙ্গে দুলে ওঠে প্রকৃতির নীরব উৎসব। মৌমাছির গুঞ্জন সেখানে সুর তোলে কখনো মৃদু, কখনো উচ্ছ্বসিত যেন ফুল আর প্রাণের গোপন কথোপকথন। হলুদ গালিচার পাশে সারি সারি মৌবাক্সে ব্যস্ত মৌচাষিরা, কারও চোখে স্বপ্ন, কারও হাতে জীবিকার আশ্বাস। এই মাঠে শুধু মধুই জন্ম নেয় না, জন্ম নেয় পরিশ্রমের মর্যাদা, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থান আর আগামীর সম্ভাবনা।
গোদাগাড়ী উপজেলার বিজয়নগর গ্রামের কৃষক খলিলুর রহমান গেল এক দশক ধরে সরিষা খেত থেকে মধু সংগ্রহের সঙ্গে জড়িত। তিনি বলেন, আমন ধান কাটার পর জমি তৈরি করে সরিষা আবাদ করা হয়। ৫৫-৬০ দিনের মাথায় ফলন ঘরে আসে। এক বিঘা জমিতে সরিষা চাষ করতে খরচ হয় ২৫০০-৩০০০ হাজার টাকা। প্রতি বিঘায় ৭-৮ মণ ফলন পাওয়া যায়। এ ছাড়া মৌবাক্স বসিয়ে ৩ থেকে ৫ কেজি পর্যন্ত মধু পাওয়া যায়।
গোদাগাড়ী উপজেলার পূর্ব বামনাল গ্রামের কৃষক আবির হোসেন বলেন, তিনি গড়ে প্রতি বাক্সে প্রায় ৫ কেজি মধু সংগ্রহ করেন। সরিষা খেত থেকে সংগৃহীত মধু বিক্রি করে প্রতি শীত মৌসুমে তিনি পাঁচ লাখ টাকারও বেশি আয় করেন।
যশোর থেকে আসা মৌচাষি আমিরুল ইসলাম জানান, বাগমারা উপজেলায় ৩০০টি মৌবাক্স বসানো হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে একাই ৪ হাজার ৫০০ কেজির বেশি মধু সংগ্রহ করতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি। একই কথা জানান সাতক্ষীরার মৌ চাষি পলাশ ও স্থানীয় খামারি রাকিব হোসেন। রাকিব বলেন, গত কয়েক বছর ধরেই এখানে মধু সংগ্রহ করছি, প্রতিবারই ভালো লাভ হয়েছে।
বিস্তীর্ণ বরেন্দ্র অঞ্চলে অনেক কৃষকের জন্য সরিষা খেতে মধু সংগ্রহ আশীর্বাদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তাদের জীবিকা এবং আয়েরও উন্নতি করছে। সরিষা গাছে ফুল ফোটার পর এখন অসংখ্য কৃষক বাণিজ্যিকভাবে মধু সংগ্রহ করে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।
তানোর উপজেলার কৃষক আলী হোসেন বলেন, সরকারি সহায়তা হিসেবে সরিষার বীজ, সার, মৌমাছি, প্রশিক্ষণ এবং ডিজিটাল মধু সংগ্রহের বাক্স, সরঞ্জাম এবং জিনিসপত্র পেয়েছি। এই সহায়তা মধু সংগ্রহে আরও অনুপ্রাণিত করেছে। তার মতো আরও অনেক কৃষক সরকারি সহায়তা পেয়ে এবং স্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের পর মধু সংগ্রহের কাজ শুরু করেছেন।
গোদাগাড়ী উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা অতনু সরকার বলেন, প্রতিটি ইউনিয়নে কৃষকদের মধু সংগ্রহের জন্য সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। মধু সংগ্রহকারীর সংখ্যা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরিষাচাষের পাশাপাশি এটাও লাভজনক।
বাংলা মাঘ মাসের কনকনে ঠান্ডা ও হিমেল হাওয়ায় সরিষার ফুল দোল খাচ্ছে। হলুদ এই গালিচায় চলছে মৌমাছির মধু সংগ্রহ। সরিষা খেতের পাশে মৌচাষিরা তাদের খামারের মৌবাক্স স্থাপন করেছে। এ মধু সংগ্রহর সময় মৌমাছির পরাগায়নের ফলে সরিষার ফলন বাড়বে বলে আশা করেছেন কৃষি বিভাগ।
চলতি রবি মৌসুমে রাজশাহী বিভাগের আটটি জেলায় ৩ লাখ ৮৯ হাজার হেক্টর জমি থেকে প্রায় ৬ লাখ ৪৬ হাজার টন সরিষা সংগ্রহের আশা করছে কৃষি বিভাগ। রাজশাহী কৃষি অঞ্চলের আওতাধীন চারটি জেলায় ১ লাখ ৮২ হাজার হেক্টর জমি থেকে ৩ লাখ ৬ হাজার টন সরিষা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। বগুড়া কৃষি অঞ্চলের আওতাধীন চারটি জেলায় ২ লাখ ৭ হাজার হেক্টর জমি থেকে আরও ৩ লাখ ৪০ হাজার টন সরিষা উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। রাজশাহী অঞ্চল থেকে প্রায় ৭ টন মধু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর রাজশাহী অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক ড. আজিজুর রহমান বলেন, প্রতি বছর নতুন নতুন এলাকায় মধু আহরণ সম্প্রসারিত হচ্ছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে উল্যেখযোগ্য অবদান রাখছে এবং মধু উৎপাদন বৃদ্ধি করছে। গেল বছরগুলোর মতো, মধু সংগ্রহকারীরা এই মৌসুমে বিভিন্ন এলাকায় বাক্স স্থাপন করেছেন। এই অঞ্চলে সরিষার ফলন বৃদ্ধির কার্যকর উপায় হিসেবে যৌগিক চাষ ক্রমবর্ধমানভাবে স্বীকৃত হচ্ছে।
অর্থ-বাণিজ্য: একীভূত ৫ ব্যাংকের আমানতকারীরা দুই বছরের মুনাফা পাবেন না
অর্থ-বাণিজ্য: পাঁচ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ৯৪০ কোটি ডলার
অর্থ-বাণিজ্য: বিএইচবিএফসির খেলাপি ঋণ কমে ৩.৪৫%
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি: বিটিসিএলের নতুন প্যাকেজ ঘোষণা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি: বিকাশের কাস্টমাইজড ‘মাই অফারস’ সেবা