এক সময় বিশাল জাহাজ আর পাল তোলা নৌকার আনাগোনায় যে নদী ছিল মুখর, আজ সেই মাথাভাঙ্গা নদীই যেন নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় আর্তনাদ করছে। চুয়াডাঙ্গা জেলা শহরকে দ্বিখণ্ডিত করে বয়ে যাওয়া ১২৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই আন্তঃসীমান্ত নদীটি এখন দখল, দূষণ আর অযতে্নর কবলে পড়ে মৃতপ্রায়। চুয়াডাঙ্গার ঐতিহ্য, সভ্যতা ও সংস্কৃতির ধারক এই নদীটি বর্তমানে পরিণত হয়েছে শহরের এক বিশালাকার ড্রেনে। জেলার প্রবীণ বাসিন্দাদের স্মৃতি হাতড়ালে পাওয়া যায় এক টইটম্বুর মাথাভাঙ্গার ছবি।
মালোপাড়ার মুরুব্বি জামাত আলী বিষণ্ণ মনে বলেন, ছোটবেলায় নদীর রাতে দেখে ভয় পেতাম। বড় বড় জাহাজ চলত এখানে। আজ নদীটার এই হাল দেখে মন ফেটে যায়। বাস্তবতা হলো, মাথাভাঙ্গা আজ শুধু নামেই নদী। ক্রমাগত পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া আর যথাযথ খননের অভাবে নদীটি সংকুচিত হয়ে নালায় পরিণত হয়েছে। এর বুক চিরে এখন আর জাহাজ চলে না।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মাথাভাঙ্গা নদীর এই মরণদশার অন্যতম কারণ চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। শহরের প্রায় সবকটি প্রধান ড্রেনের মুখ সরাসরি যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে নদীর সঙ্গে। চব্বিশ ঘণ্টা পৌরসভার নোংরা পানি, হোটেলের আবর্জনা, প্লাস্টিক এবং বাজারের পচা বর্জ্য মিশছে নদীর স্বচ্ছ জলে। বিশেষ করে নিচের বাজার এলাকার মাংস পট্টির বর্জ্য এবং ব্রিজ সংলগ্ন হোটেলগুলোর উচ্ছিষ্ট সরাসরি নদীতে ফেলায় নদীর পানি কালো হয়ে যাচ্ছে। এলাকাটি দিয়ে যাতায়াত করলেই নাকে আসে উৎকট দুর্গন্ধ। স্থানীয় যুবক রিমন আলীর মতে, আগে যেখানে বন্ধুরা মিলে সাতার কাটতাম, আজ সেখানে দুর্গন্ধের চোটে দাড়ানোই দায়। মাথাভাঙ্গা কেবল একটি নদী নয়, এটি চিত্রা, নবগঙ্গা ও ভৈরবের মতো নদীগুলোর উৎস। ফলে মাথাভাঙ্গা মারা গেলে এই অঞ্চলের পুরো নদী ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়বে। বর্তমানে নদীর পানি এতটাই দূষিত যে, তা ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। চর্মরোগ, ডায়রিয়া ও আমাশয়সহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি নিয়ে তবুও অনেক প্রান্তিক মানুষ এই পানিতেই নিত্যকাজ সারছেন। অন্যদিকে, দূষণের কারণে প্রায় হারিয়ে গেছে দেশি প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণী।
নদীটি রক্ষায় দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করছে ‘মাথাভাঙ্গা নদী বাঁচাও আন্দোলন’। তবে শক্তিশালী দখলদারদের সামনে তারা যেন অসহায়। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ শাহজাহান আলী ক্ষোভের সঙ্গে জানান, সরকারি-বেসরকারি বহু প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান নদীর জায়গা দখল করে রেখেছে। এমনকি ওয়েভ ফাউন্ডেশনের মতো বড় এনজিওর ভবনও নদীর সীমানার ভেতরে ঢুকে পড়েছে।
সংগঠনের সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক মুন্সি সরাসরি আঙুল তুলেছেন পৌরসভার দিকে। তিনি বলেন, মাথাভাঙ্গা নদীর গলার কাটা চুয়াডাঙ্গা পৌরসভা। তারা নদীটিকে ড্রেন বানিয়ে ছাড়ছে। প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ ছাড়া নদী রক্ষা সম্ভব নয়।
নদীটির এমন শোচনীয় অবস্থায় চুয়াডাঙ্গা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফ আহমেদ বলেন, আন্তঃসীমান্ত নদী হওয়ার কারণে বিষয়গুলো মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে এবং তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। তবে আশার কথা শুনিয়েছেন চুয়াডাঙ্গার নবাগত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেন। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, নদী দূষণকারীদের কোনো ছাড় নেই। জরিমানা নয়, এখন থেকে সরাসরি জেল হবে। পরিবেশ আইনে ব্যবস্থা নিয়ে আমি এই নদীকে বাঁচাতে চাই।
চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার প্রশাসক ও স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক শারমিন আক্তার বলেন, চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার ড্রেনগুলো নদীতে গিয়ে পড়েছে। আমি জানার পর সংশ্লিষ্ট বিভাবে নোটিস করেছি। তবে এখনও আমরা বিকল্প পাইনি। এ বিষয়ে আপনাদের সকলের সহযোগিতা নিয়ে আমরা কাজ করবো। আপনাদের সঙ্গে বসব।
অর্থ-বাণিজ্য: দেশের ইতিহাসে স্বর্ণের দামে নতুন রেকর্ড
অর্থ-বাণিজ্য: পাঁচ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ৯৪০ কোটি ডলার
অর্থ-বাণিজ্য: বিএইচবিএফসির খেলাপি ঋণ কমে ৩.৪৫%
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি: বিটিসিএলের নতুন প্যাকেজ ঘোষণা