রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের ওপর প্রকাশ্য হামলা এবং প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তায় নীলফামারীর ডিমলায় বুড়ি তিস্তা নদী খনন প্রকল্পের বাস্তবায়ন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দুর্বল অবস্থান ও কার্যকর প্রতিরোধের অভাবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) একটি রাষ্ট্রীয় মেগা প্রকল্প বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পাউবোর রেকর্ডভুক্ত নিজস্ব জমিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিলেই সংঘবদ্ধ ভূমিদস্যুদের হামলায় কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে কর্তৃপক্ষ ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বকে প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ জানিয়ে নীলফামারীর ডিমলা-জলঢাকা সংযোগস্থলে অবস্থিত কেপিআইভুক্ত বুড়ি তিস্তা ব্যারেজ ও কালীগঞ্জ ব্রিজের নিরাপত্তায় নিয়োজিত গুরুত্বপূর্ণ আনসার ক্যাম্পে দুই দফায় সুপরিকল্পিত হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালিয়েছে ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসীচক্র। এসব ঘটনায় আনসার সদস্যদের অস্ত্রের গুলি লুট, সরকারি স্থাপনা ধ্বংস এবং প্রায় আড়াই কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হলেও এখন পর্যন্ত লুট হওয়া অস্ত্র ও মালামাল উদ্ধার কিংবা একজনকেও গ্রেপ্তার করতে পারেনি প্রশাসন।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালের মে মাসে অনুমোদিত ‘বুড়ি তিস্তা সেচ প্রকল্পের কমান্ড এলাকার পুনর্বাসন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প’-এর মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। এর মধ্যে বুড়ি তিস্তা সেচ প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ১২০ কোটি টাকা। প্রথম পর্যায়ে পাঁচটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দিয়ে ৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নদী খননের কাজ শুরু করা হয়।
প্রকল্প এলাকায় পাউবোর অধীনে এসএ ও বিএস রেকর্ডভুক্ত মোট ১ হাজার ২১৭ একর জমি রয়েছে। এর মধ্যে ৬৬৭ একর জমিতে খননসহ মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের অনুমোদন থাকলেও বুড়ি তিস্তা ব্যারেজসংলগ্ন ও উজানের কুঠিরডাঙ্গা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ৭ শতাধিক ভূমিদস্যু পাউবোর জমি জবরদখল করে রেখেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
খনন কাজ শুরু করলেই দখলদারদের সঙ্গে পাউবো ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সংঘর্ষ বাধে। একাধিকবার ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, সংঘর্ষ ও মামলা হলেও দখলদারদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নেয়ায় তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ভূমিদস্যু নেতা হিসেবে পরিচিত আব্দুল আলীমের নেতৃত্বে মাইকিং করে শত শত লোক জড়ো করে আনসার ক্যাম্পে হামলা চালানো হয়। এ সময় ক্যাম্পে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। আনসার সদস্যদের ১০ রাউন্ড গুলি, প্রায় ৫০ জন আনসার সদস্যের ব্যক্তিগত মালামাল, আসবাবপত্র, রেশন ও নগদ অর্থ লুট করা হয়। পাশাপাশি খনন কাজে ব্যবহৃত সাতটি এক্সকাভেটর ভেঙে অকেজো করে দেয়া হয়।
পরদিন ১ জানুয়ারি সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দ্বিতীয় দফায় হামলা চালিয়ে আনসার সদস্যদের অস্ত্রের মুখে ক্যাম্প ছাড়তে বাধ্য করা হয়। অবশিষ্ট মালামাল লুট করে সব স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়া হয়।
পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করলে বিকেল ৫টার দিকে বিপুলসংখ্যক সেনাসদস্যের সহায়তায় জলঢাকা ও ডিমলা থানার পুলিশ জবরদখল হওয়া আনসার ক্যাম্প পুনরুদ্ধার করে। তবে ততক্ষণে ক্যাম্পে কার্যত কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। একটি পাকা ভবন উদ্ধার করা হলেও সেটির দরজা-জানালাও খুলে নিয়ে যায় চিহ্নিত দুর্বৃত্তরা।
পাউবোর হিসাব অনুযায়ী, এই সহিংসতায় প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ ঘটনায় জলঢাকা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. জুলফিকার রহমান বাদী হয়ে গত ৩ জানুয়ারি জলঢাকা থানায় ৪১ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা প্রায় ৭ শতাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেন।
তবে মামলা দায়েরের দিনই সন্ধ্যায় ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা চালায় অভিযুক্ত পক্ষ। কুঠিরডাঙ্গা এলাকায় মশাল মিছিল এবং পরদিন ৪ জানুয়ারি মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে মানববন্ধন করা হয়। সচেতন মহলের অভিযোগ, বিচার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার ও অপরাধ আড়াল করতেই প্রকাশ্যে এসব কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে।
নীলফামারী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আতিকুর রহমান বলেন, ‘একটি অসাধু গোষ্ঠী বুড়ি তিস্তা জলাধার খনন ঠেকাতে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে সাধারণ মানুষকে ব্যবহার করছে। পাউবো কেবল অধিগ্রহণকৃত ১ হাজার ২১৭ একরের মধ্যে ৬৬৭ একর জমিতেই কাজ করবে। ব্যক্তিগত তিন ফসলি জমি দখলের অপপ্রচার সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।’
তিনি আরও বলেন, ‘কেপিআইভুক্ত বুড়ি তিস্তা ব্যারেজ ও আনসার ক্যাম্পে হামলা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি। আগের ঘটনাগুলোতে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় সন্ত্রাসীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। দ্রুত কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।’
এই ঘটনায় কেপিআই স্থাপনার নিরাপত্তা, মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রশাসনের প্রস্তুতি এবং সংঘবদ্ধ ভূমিদস্যু চক্রের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে সারাদেশে নতুন করে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।