জ্বালানির দাম বাড়ায় সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় গোবরের লাকড়ির চাহিদা এখন ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে। গ্রামগঞ্জে চায়ের দোকান থেকে শুরু করে রান্না-বান্নার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে গোবরের লাকড়ি। সেই সঙ্গে গোবরের লাকড়ি বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন অনেক অসহায় পরিবার। অনেকের আয়ের উৎস এখন গোবরের লাকড়ি। উপজেলার সর্বত্রই কাঁচা-পাকা রাস্তার ধারে এখন শোভা পাচ্ছে গোবরের লাকড়ি শুকানোর দৃশ্য। কমবেশি সারাবছর এ ধারা অব্যাহত থাকলেও বিশেষ করে শীতকালে লাকড়ি তৈরির চাহিদা অনেক বেশি।
উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার আনাচে-কানাচে ও রাস্তাগুলোতে গোবরের লাকড়ি তৈরি এবং শুকানোর দৃশ্য যেন চোখে পরার মতো। খোঁজ নিয়ে এবং বিভিন্ন অসহায় পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গো-চারণ ভূমিতে এখন আর গরু চড়ান না গরু মালিক ও খামারিরা। গ্রামের হাতেগোনা কিছু সংখ্যক গরুর মালিক রাস্তার ধারে গরু চরান। সেই গরুর গোবর সঙ্গে সঙ্গে আবাদি জমিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেন কৃষকরা। এখন বেশিরভাগ গরু গোয়াল ঘরে লালন-পালন করেন মালিকগণ। সে কারণে অনেক অসহায় পরিবারের নারী ও পুরুষ শ্রমিকরা শ্রমের বিনিময়ে গোবর নিয়ে এসে বা সামান্য টাকা দিয়ে গোবর কিনে এনে লাকড়ি তৈরি করে তা বিক্রি করছেন এবং সেই সঙ্গে নিজে রান্না-বান্নার কাজে ব্যবহার করছেন।
দহবন্দ ইউনিয়নের দত্তপাড়া গ্রামের শুকলাল বালা বলেন, তিনি একজন গরু মালিকের বাড়ি থেকে শ্রমের বিনিময়ে গোবর নিয়ে এসে লাকড়ি তৈরি করে বাজারে বা চায়ের দোকানে বিক্রি করে সংসার চালান। সেই সঙ্গে নিজে রান্নার কাজে ব্যবহার করেন। তিনি আরও বলেন, পাটকাঠি, ভুট্টার ডাটা ও বাঁশের কঞ্চির মধ্যে গোবরের আস্তর দিয়ে লাকড়ি তৈরি করা হয়। অনেকে কাঁঠের গুড়া মিশাল দিয়ে লাকড়ি তৈরি করেন। প্রতিটি লাকড়ি তৈরি করতে প্রায় ২ টাকা খরচ হয়। বাজারে বা চায়ের দোকানে প্রতিটি লাঠি বিক্রি হয় ৪-৫ টাকায়।
বেলকা গ্রামের জবেদা খাতুন বলেন, তিনি তার নিজস্ব গরুর গোবর দিয়ে লাকড়ি তৈরি করেন। তাকে শুধু পাটকাঠি কিনে আনতে হয়। শীতকালে লাকড়ি শুকাতে অনেক সময় লাগে। তিনি বাজারে বিক্রি করেন না, বর্ষাকালে রান্না-বান্না করার জন্য খড়ির ঘরে মজুদ করে রাখেন। এতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়।
পৌরসভার মনজু মিয়া বলেন, তার ২টি গরু রয়েছে। ভাল গোবর দিয়ে লাকড়ি তৈরি করেন। আর ময়লা আর্বজনাযুক্ত গোবর আবাদি জমিতে জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করেন। রান্না-বান্নার জন্য সারাবছর এই গোবরের লাকড়ি ব্যবহার করা হয়। গ্যাস কেনার প্রয়োজন হয় না।
শিশু সাহিত্যিক কঙ্কন সরকার বলেন, এটি দীর্ঘ দিনের রেওয়াজ। আগেকার মানুষ গোবরের লাড্ডু তৈরি করে গোয়াল ঘরে মশা তাড়ানো বা ঠা-ার দিনে গোয়াল ঘর গরম রাখার জন্য আগুন জ্বালিয়ে রাখতো। এখন সেই লাড্ডুর পরিবর্তে লাকড়ি তৈরি করছে। বর্তমানে অল্প আয়ের মানুষজন জ্বালানির কাজে গোবরের লাকড়ি ব্যবহার করছেন। সেই সঙ্গে অসহায় পরিবারগুলো লাকড়ি বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন। গ্রামগঞ্জে রাস্তার মোড়ের চায়ের দোকানগুলোতে গোবরের লাকড়ি ব্যবহার করে চা বিক্রি করছেন অনেকে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার বিপ্লব কুমার দে বলেন, গরুর গোবর থেকে বায়ো গ্যাস, জৈব সার ও লাকড়ি তৈরি করে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ইদানিং গোবরের লাকড়ির তৈরি প্রবণতা ব্যাপকহারে বেড়ে গেছে। এটি গ্রামগঞ্জে অনেকটা জ্বালানির চাহিদা পূরণ করছে।
উপজেলা কৃষি অফিসার রাশিদুল কবির বলেন, গরুর গোবর দিয়ে ভার্মি কম্পোষ্ট তৈরি করা হয়। এছাড়া জৈব সার হিসেবে আবাদি জমিতে ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে গোবরের লাকড়ি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।