ইরি-বোরো ধান লাগানোর মৌসুম চলছে। আর তাই শীতের তীব্রতা উপেক্ষা করেই ইরি-বোরো লাগাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষান-কৃষানিরা।
নরসিংদীতে ইরি-বোরো ধান লাগানো নিয়ে গ্রামে গ্রামে এখন চলছে উৎসবের আমেজ। কেউ বীজতলা থেকে ধানের চারা তুলছেন। আবার কেউ জমি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় ব্যস্ত, কেউ জমিতে হাল চাষ দিচ্ছেন। এ দৃশ্য দেখা যাচ্ছে জেলার বিভিন্ন মাঠে। কৃষকদের আশা, আবহাওয়া ভালো থাকলে এবার তারা বোরো ধানের বাম্পার ফলন পাবেন। গত বছরের তুলনায় এ বছর বাজারে ধানের দাম ভালো থাকায় জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ইরি-বোরো ধান চাষে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের। তবে কিটনাশক, সার, ফসফেটের দাম, বিদ্যুতের দিকে সরকারের সুদৃষ্টি দেয়ার দাবি জানিয়েছেন কৃষকরা। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় চলতি মৌসুমে ৫৬ হাজার ৭০০ শত হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো ধান লাগানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। জেলার ৬টি উপজেলার মধ্যে শিবপুর, মনোহরদী, রায়পুরা, বেলাব, পলাশ উপজেলায় ইরি-বোরোর আবাদের পরিমাণ বেশি।
বেলাব উপজেলার বাজনাব গ্রামের হযরত আলী জানান, শীতের কুশায়া কম থাকায় বীজতলায় কোনো প্রকার ক্ষতি হয়নি। এছাড়া বাজারে সার ও ওষুধ দাম বৃদ্ধি থাকায় বোরো আবাদে চিন্তার ভাঁজ। এবার দুই বিঘা জমিতে ব্রি-২৮, ব্রি-২৯ ধানের আবাদ করেছেন। ধান আবাদে যে পরিমাণ খরচ হয় বাজারের ধানের দাম কম থাকায় কৃষকদের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। গত আমন মৌসুমে ধানের দাম ভালোই ছিল। আশা করছি এ বছর ধানের দাম ভালো থাকবে।
শিবপুর উপজেলার মুনসেফেরচর গ্রামে ইটাখোলা টু আজমতপুর সড়কের পাশের জমিতে বোর ধানের চারা লাগাতে ছিলেন ধান চাষি মহসিনসহ অনেকেই জানান, ধানের দাম বাজার বেশি থাকায় বোরো রোপণ করছি অধিকাংশ জমিতে। আরও অনেক জমিতে রোপণ করা বাকি আছে। বাজারের ধানের দাম বেশি। তাই বোরো ধান চাষ বেশি আবাদ করবেন বলে জানান তারা।
একই উপজেলার জয়নগর গ্রামের কৃষক অহিদ জানান, এবার প্রায় দুই বিঘা জমিতে ইরি ধান আবাদ করছি। শ্রমিক সংকট থাকায় চুক্তি দিতে হয়েছে। বিঘাপ্রতি তিন হাজার থেকে তিন হাজার পাঁচশ টাকার মতো দিতে হচ্ছে। বীজতলা থেকে শুরু করে সার, ওষুধসহ জমিতে লাগানো পর্যন্ত বিঘাপ্রতি প্রায় ছয় থেকে সাত হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে। এছাড়া অনেকে ৭০০-৮০০ টাকা করে শ্রমিকে দিয়ে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কাজ করে নিচ্ছেন।
রায়পুরা উপজেলার বাখানগর গ্রামের কৃষক তাজুল ইসলাম জানান, কৃষিতে উৎপাদন খরচ দিন দিন যেভাবে বাড়ছে সে তুলনায় ধানের দাম বাড়ছে না। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়লেও ধানের সেইভাবে দাম বাড়ে না। কিছু দালাল/ফড়িয়ার কারণে প্রতি বছরই কৃষককে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয় জমি বর্গা নিয়ে আবাদ করেন যেসব কৃষক। সরকারকে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান ক্রয় এবং দাম বাড়ানোর জন্য দাবি জানিয়েছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আজিজল হক জানান, জেলায় চলতি মৌসুমে ৫৬ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো ধান লাগানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আশা করছি লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। জেলায় সর্বত্রই চাষাবাদের জন্য জমি প্রস্তুত করছে কৃষকরা। জেলার সব এলাকার কৃষকই বোরো আবাদে নিজস্ব বীজতলা করেছে। বীজতলায় চারার মানও ভালো আছে। বাজারে ইউরিয়া, ফসফেট, টিএসপি, পটাশসহ সব ধরনের সার, তেলের সরবরাহ সন্তোষজনক থাকায় ইরি-বোরো ধানের ভরা মৌসুমেও সংকট থাকবে না। আমাদের তদারকি আছে। এ ছাড়া কৃষকদের সাবির্ক পরামর্শ দেয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।
দামুড়হুদায় কাদা জলে বোরো রোপণে ব্যস্ত চাষিরা
প্রতিনিধি, দামুড়হুদা (চুয়াডাঙ্গা) থেকে জানান, কন কনে শীতে আর থক থকে কাদার হিমেল পানিতে কেমর বেঁধে মাঠে নেমেছে বোর ধান লাগাতে মাঠের সবুজ কারিগররা। এ যেন তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। আর কয়েকদিন পরে মাঠজুড়ে জানান দেবে মাঠের সবুজ ধানের খেত প্রকৃত রূপকার তারাই। তবুও তারা রোজ সকালে কন কনে শীতে পান্তা নিয়ে সব কিছু পেছনে ফেলে বোর লাগাতে মাঠে নামে। বোর ধানে মাঠজুড়ে সবুজ বিপ্লব ঘটাতে কোনো বাধা তারা মানে না। শীতের মাঠের এই রুপকাররা মাঠজুড়ে ফলাবে সোনালী ধানের বাম্পার ফলন। তাদের মন্তব্য উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলেও নিজেদের খাদ্যের চাহিদা মেটাতে ও সচ্ছলতার জন্য বোরো আবাদে প্রতি বছরের মতো এবারও এগিয়ে এসেছি। ধান এবং বিচলির বাজার দর ভালো থাকায় চাঙা হয়ে উঠবে গ্রামীণ অর্থনীতি। ধান এবং বিচলির বাজার দর ভালো থাকায় প্রকৃতির সব বৈরী বাধা পেছনে ফেলে চাঙা হয়ে কোমর বেঁধে বোরো লাগাতে মাঠে নেমেছি। বোরো মৌসুমে উঠতি ধান এবং বিচলির বাজার দর ভালো থাকালে চাঙা হবে গ্রামীণ অর্থনীতি।
উপজেলার বোরো চাষি ছাওার বিশ্বাস, হামিদসহ একাধিক চাষি বলেন, কৃষিপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে বেড়েছে সেচ, লাঙ্গল ও শ্রমিকের মজুরির দাম। গত কয়েক বছর ধরে ধান উৎপাদনে বাড়তি খরচ যোগ হয়েছে। ধান আবাদে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলেও নিজেদের খাদ্যের চাহিদা মেটাতে ও সচ্ছলতার জন্য বোরো চাষ করতে প্রতি বছর এগিয়ে আসতে হয়। এবার আমন ধানের বাম্পার ফলন ধান এবং বিচলির বাজার দর ভালো থাকায় চাঙা হয়ে উঠছে গ্রামীণ অর্থনীতি। ধান এবং বিচলির বাজার দর ভালো রয়েছে। কন কনে শীতে আর থক থকে কাদা জলে হিমেল পানিতে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছি। গ্রামের বিল মাঠে দেড় বিঘা জমিতে বৈরী আবহওয়া মধ্যে বোর লাগানোর কাজ শেষ করেছি। এবার দেড় বিঘা জমিতে ধান রোপণ করতে প্রায় দশ হাজার খরচ হয়ে গেছে। অপর চাষি ডাবলু ও জামসেদ বিল মাঠে ধান লাগানোর কাজ শেষ করেছে। মাঠে বিভিন্ন স্থানে জমি প্রস্তুতের পালা চলছে। অল্প পরিমাণ ধান লাগানো হয়েছে। আরও দুই বিঘা জমিতে বোর ধানের আবাদ করব। কয়েক দিনের ঘন কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহ চলাকালে অনেকে ধানের চারা রোপণ বন্ধ রেখেছেন। শীত একটু কম হলে দল বেঁধে আবার রোপণ কাজ শুরু করবে। ঘন কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহ চলাকালে বীজতলা কুয়াশার কবল থেকে রক্ষা করতে সন্ধ্যায় বীজ তলায় সেচ দিয়ে সকালে পানি বের করে দেওয়ার পরামর্শসহ এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি বিভাগ বীজতলা রক্ষার জন্য চাষিদের করণীয় সর্ম্পকে পরামর্শ দিয়েছেন। কৃষি বিষয়ে কৃষি কর্মকর্তারা বোরো চাষিদের দোর গোড়ায় গিয়ে এবং মাঠপর্যায়ে গিয়ে পরামর্শ দিচ্ছে। এজন পদে বোরো ধানের বাম্পার ফলনের জন্য কৃষি বিভাগ নানা ধরণের উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকে। এবারও কৃষি বিভাগ বোরো ধানের বাম্পার ফলনের জন্য মাঠপর্যায়ে বোরো মৌসুম শুরু থেকে চাষিদের সঙ্গে পরামর্শ জন্য কাজ শুরু করে তা অব্যাহত রেখেছে। চাষিদের মাঝে সুষম সার ব্যবহার বলাই নাশক ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।