image

তিস্তা-যমুনা চরের ১৫ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে

আফতাব হোসেন, গাইবান্ধা

গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার দিঘলকান্দি চরের কৃষি শ্রমিক আব্দুল খালেক প্রামাণিক। ছয় সদস্যের সংসার চলে তার দৈনিক আয়ে। কিন্তু বর্তমানে এলাকায় কোনো কাজ নেই। বছরের এই সময়টায় সাধারণত তিনি বা তার মতো শ্রমিকরা কাজের সন্ধানে অন্য জেলায় যান, কিন্তু এবার সেখানেও কৃষি শ্রমিকের চাহিদা নেই। ফলে বাধ্য হয়ে অলস সময় পার করছেন বাড়িতেই। গত এক মাস ধরে রোজগার বন্ধ থাকায় ধারদেনা ও চড়া সুদে ঋণ নিয়ে কোনোমতে সংসার চালাচ্ছেন তিনি।

শুধু আব্দুল খালেক নন; একই গ্রামের চান্দু মোল্লা, নুর ইসলাম, আব্দুল আজিজ, জামাত আলীসহ চরাঞ্চলের হাজারো শ্রমজীবীর গল্প এখন একই। কাজের তীব্র সংকটে তিস্তা ও যমুনা পাড়ের শ্রমজীবী মানুষের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ। কাজ না থাকায় গাইবান্ধাসহ উত্তরাঞ্চলের চরাঞ্চলের প্রায় ১৫ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়েছেন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, একজন মানুষ মাসে গড়ে ৩ হাজার ৮২২ টাকার নিচে আয় করলে তিনি দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করেন। বাংলাদেশে ৪ থেকে ৫ সদস্যের একটি পরিবার সাধারণত একজনের আয়ের ওপর নির্ভরশীল। গত কয়েক বছরে কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন, নদীভাঙন রোধ এবং সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগে রংপুর বিভাগের কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, দিনাজপুর ও গাইবান্ধা জেলা শীর্ষ ১০ দরিদ্র জেলার তালিকা থেকে বেরিয়ে এসেছিল। কিন্তু বর্তমানে কর্মসংস্থানের অভাবে সেই অর্জন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা গণউন্নয়ন কেন্দ্রের (জিইউকে) তথ্য অনুযায়ী, রংপুর বিভাগের ৪৬০টি চরের প্রায় ২৪ লাখ মানুষ সরাসরি কৃষি শ্রম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এরমধ্যে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ বর্তমানে কাজের অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। দিনমজুর এসব মানুষ একদিন কাজ না পেলে অন্যের কাছে হাত পাততে বাধ্য হন।

এ বিষয়ে গণউন্নয়ন কেন্দ্রের (জিইউকে) নির্বাহী প্রধান ও উন্নয়ন গবেষক এম. আবদুস সালাম বলেন, উত্তরাঞ্চলের মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। এখানকার ৭০ শতাংশ মানুষ কৃষি শ্রমের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সারা বছর কৃষিতে কাজ থাকে না। এই সাময়িক বেকারত্ব দূর করতে বিকল্প কর্মসংস্থান ও স্থায়ী আয়ের পথ তৈরি করা জরুরি।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া গ্রামের পরিমল পাল বলেন, চরে শ্রম দিয়ে খাই। কিন্তু এখন কাজ নেই, পকেটে টাকাও নেই। সংসার চালানোই দায় হয়ে পড়েছে। চন্ডিপুর ইউনিয়নের কৃষক আব্দুর রউফ সরকার জানান, চরে কৃষিকাজ হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু শ্রমিকের মজুরি আর ফসলের দামের অসামঞ্জস্যতায় কৃষকরাও বিপাকে আছেন, ফলে শ্রমিকের কাজ কমছে। রংপুরের পীরগাছা উপজেলার তাহাজুল ইসলাম বলেন, আগে অন্য জেলায় কাজ করতে যেতাম, এখন সেখানেও ডাক পড়ে না।

স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতারা বলছেন, এই অঞ্চলের দারিদ্র্য বিমোচনে ভারী শিল্পকারখানা স্থাপনের বিকল্প নেই। গাইবান্ধা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহামুন্নবী টিটুল বলেন, তিস্তা ও উত্তরের জনপদে ভারী শিল্পকারখানা স্থাপন না করা হলে এখানকার মানুষের জীবনমানের টেকসই উন্নয়ন ঘটবে না। উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক বাবুল আহমেদ বলেন, তিস্তা বাঁচলে কৃষি বাঁচবে। নদী রক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে কৃষিতে বিপ্লব ঘটবে, যা আমাদের অস্তিত্বের লড়াই।

পানি বিশেষজ্ঞ ও ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত এ প্রসঙ্গে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপখাইয়ে চলা মানুষের জন্য কৃষি ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে সরকারকে জোরালো উদ্যোগ নিতে হবে। উত্তরাঞ্চলের টেকসই উন্নয়নের জন্য সঠিক পরিকল্পনা এবং স্থানীয়ভাবে বেকার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা প্রয়োজন।

‘সারাদেশ’ : আরও খবর

» সৈয়দপুরে শিক্ষায় আলোকিত করার বাতিঘর এফ ও এইচ স্কুল

সম্প্রতি