image

মানিকগঞ্জে হলুদে হলুদে সেজেছে ফসলের মাঠ, মধু আহরনে ব্যস্ত মৌচাষিরা

প্রতিনিধি, ঘিওর (মানিকগঞ্জ) ও নাগেশ্বরী (কুড়িগ্রাম)

সরিষার ভরা মৌসুম। হলুদ রঙে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মন ভরে ওঠে। গ্রামের দিগন্তজোরা মাঠ সেজেছে হলুদ সরিষা ফুলের সমারোহে। যতদূর চোখ যায় শুধু হলুদ আর হলুদের মাখামাখি। এই সময়ে ব্যস্ত সময় পার করছে মৌচাষিরা। সরিষার আবাদ হয়েছে চোখে পড়ার মতো।

মানিকগঞ্জের ৭টি উপজেলাতে চলতি মৌসুমে ৭১ হাজার ৩৫০ মে. টন মধু সরিষা ফুল থেকে সংগ্রহ করার টার্গেট করে দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছে মৌচাষিরা। প্রায় সোয়া কোটি টাকা মধু বিক্রয় হবে বলে ধারণা করছে মৌচাষিরা। ঘিওর, দৌলতপুর, শিবালয়, সাটুরিয়া, সিংগাইর, হরিরামপুর, এলাকার বিভিন্ন স্থানে ৪ শতাধিক মৌয়ালরা সরিষা ক্ষেতে কাঠের বাক্স মৌমাছি পালন করে মধু উৎপাদন মাঠে নেমে পরেছে। মৌচাষিরা সকালে তাদের বাস্ক থেকে মৌমাছি ছেড়ে দেয়। সন্ধ্যার সময় দল বেঁধে মৌমাছি মধু আহরণ করে আবার ফিরে আসে। মধু ভারত, মালেশিয়া, কুয়েতসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছে এলাকার অনেক যুবক। বেকার যুবকের অনেকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিয়ে অর্থ উদ্ধাম্বনী চিন্তা ও আত্মবিশ^াসকে বিনিয়োগ করেছে সরিষা খেতে মৌমাছি পালন ও মধু উৎপাদন খাতে।

মানিকগঞ্জের সদর ঘিওর, দৌলতপুর, শিবালয়, সাটুরিয়া, সিংগাইর, হরিরামপুরে সরিষা ফুল থেকে মধু সংগ্রহের জন্য ৪ শতাধীক মৌ খামারি সরিষা ক্ষেতের আশে পাশে সাড়ে ৪ হাজার বাক্স বসিয়েছেন। ফরিদপুর, যশোহর, গাজিপুর, পাবনা, নারায়নগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, সাতক্ষিরা ও খুলনা থেকে অনেক মৌচাষিরা মানিকগঞ্জের ৭টি উপজেলার বিভিন্ন স্থানে মধু সংগ্রহের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে। শুধু মধু সংগ্রহের পরে সরিষা যেমন দিচ্ছে তেল, সঙ্গে দিচ্ছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। এসব এলাকাগুলোতে এখন সৌখিন প্রকৃতি প্রেমিরা বেড়াতে আসছে প্রতিদিন। তারা অপরূপ সোন্দর্য ধরে রাখার জন্য ক্যামেরা বন্দি করে রাখছেন। যুবক-যুবতি, কিশোর-কিশোরী থেকে শুরু করে প্রকৃতিপ্রেমী সব শ্রেণির এই অপরূপ দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হচ্ছে। এছাড়া সরিষা চাষে রয়েছে দ্বিগুণ লাভ। জমির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধির জন্য এর ফুল ও পাতা ঝরে জৈব সার তৈরি হয়। ফলে মানিকগঞ্জের ৭টি উপজেলার অনেক কৃষক ধানের পাশাপাশি সরিষা চাষের দিকে ঝুঁকে পরেছে। চলতি বছরে আবহাওয়া অনুকূলে থাকার দরুন সরিষা আবাদ করে অনেক কৃষক বেশি লাভবান হয়েছে। মানিকগঞ্জে সরিষা ফুলে ছেয়ে গেছে পুরো মাঠ। সরিষা ফুলের মনমাতানো গন্ধে সবাইবে আকৃষ্ট করে। এক বিঘা জমিতে চলতি মৌসুমে সরিষা আবাদে খরচ হয়ছে এক থেকে দেড় হাজার টাকা। ফলন ভাল হলে প্রতি বিঘাতে চার থেকে পাঁচ মন সরিষা আবাদ হবে।

বর্তমানে বিভিন্ন হাট বাজারে প্রতিমন সরিষা ২৮শ টাকা থেকে ২৩ হাজার টাকা বিক্রি হচ্ছে। অন্যান্য ফসলের চেয়ে সরিষা অবাদ করলে লাভ দ্বিগুণ হয়। কাজেই সরিষা চাষে কৃষকরা বেশি আগ্রহ থাকে। প্রতি বছর মৌচাষিরা নভেম্বর মাস থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরিষা ফুল থেকে মধু সংগ্রহের জন্য বেড়িয়ে পরে।

সাতক্ষিরা শ্যমনগর উপজেলার মৌচাষি হাবিবুর রহমান জানান, গত বছরে প্রতিদিন তাদের একটি খামারে প্রায় ১০ থেকে ১২ টন মধু আহরন হয়। তাদের মধু স্কয়ার, বেক্সিমকোসহ বিভিন্ন কোম্পানিতে বিক্রিয় করা হয়। শ্যামনগর এলাকার মৌচাষী সিরাজুল ইসলাম জানান, আমরা মানিকগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলাতে তিন থেকে প্রায় ৪ শতাধিক খামারির প্রায় এক হাজার লোক এসেছি সরিষা ফুল থেকে মধু সংগ্রহের জন্য। ঘিওর উপজেলাতে দেড় শতাধিক বাক্স বসিয়েছি। প্রতি সপ্তাহে এক বার বাস্ক থেকে মধু বের করা হয়। প্রতিটি বাক্স থেকে তিন চার কেজি মধু পাওয়া যায়। মানিকগঞ্জে দুই মাস মধু সংগ্রহের পরে তারা আবার গোপালগঞ্জ যাবে মধু সংগ্রহের জন্য। বছরে তারা ছয় মাস মধু সংগ্রহের কাজে ব্যস্ত থাকেন। খুচরা প্রতি কেজি মধু তারা ৪৫০ টাকা থেকে ৫শ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেন। কোম্পানির কাছে তারা ২৫০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা কেজি মধু বিক্রি করেন। সরকার যদি মূল্য ঠিক করে দিতেন তাহলে মৌয়ালরা লাভবান হতেন। মানিকগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (খামারবাড়ি) মো. শাহজাহান সিরাজ বলেন, ৬৩ হাজার ৫৩০ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ করা হয়েছে। চলতি মৌসুমে সরিষা ফুল থেকে প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ টন মধু আহরণের সম্ভবনা রয়েছে। তবে সকালে ঘন কুয়াশা এবং শৈত্যপ্রবাহের কারণে সরিষা আবাদ কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। তবে আশা করি ফলন ভালো হবে। আমরা কৃষকদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করি এবং সার্বক্ষণিক বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দিয়ে আসছি।

নাগেশ^রীতে ৯৬০ হেক্টর বেশি জমিতে সরিষার চাষ

প্রতিনিধি, নাগেশ^রী (কুড়িগ্রাম) থেকে জানান, নাগেশ^রীতে জনপ্রিয়তা বেড়েছে সরিষায়। প্রতি বছর বাড়ছে এর চাষাবাদ। গত বছরের তুলনায় কৃষক এবারে ৯৬০ হেক্টর বেশি জমিতে সরিষার চাষ করেছেন কৃষক। ভালো ফলনের আশায় স্বপ্ন বেঁধেছে কৃষক।

উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, এবারে উপজেলায় ৫ হাজার ৩শ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষের লক্ষামাত্রা নির্ধারণ করা হয়। প্রণোদনা দেয়া হয় ৩ হাজার ১শ জন কৃষককে। স্থানীয় জাতের পাশাপাশি বারি ও বিনা জাতের সরিষার চাষ হয়েছে ৫ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে। গত বছর সরিষার চাষ হয় ৪ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে। ক্রমে দৃশ্যমান হচ্ছে সরিষার জনপ্রিয়তা। বাড়ছে চাষাবাদ। অনুকূল আবহাওয়া ও নিয়মিত পরিচর্যায় শস্যটির ভালো ফলনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এতে এ এলাকায় ভোজ্য তেলের আমদানি নির্ভরতা কিছুটা কমাতে বিকল্প হতে পারে সরিষা।

এই সরিষায় আশার আলো দেখছেন কৃষক। জীবনকাল অনেক কম। খরচও কম টাকা। বাজারে ভালো দাম। ফলে অনেকেই আমন ঘরে তোলার পর সে জমিতে সরিষার চাষ করেন। সরিষা তুলে যথাসময়ে বোরো ধান চাষ করা যায়। এতে একই জমিতে বছরে তিনবার ফসল উৎপাদন সম্ভব। সরকারিভাবে কৃষকদের প্রণোদনা হিসেবে দেয়া হচ্ছে বীজ ও সার। ফলে সরিষায় জনপ্রিয়তা বাড়ছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, আমন ধান সংগ্রহের পর সে জমিতে উপজেলার সবগুলো ইউনিয়নে সরিষার চাষ হলেও নেওয়াশী, সন্তোষপুর, বেরুবাড়ী, ভিতরবন্দ, হাসনাবাদহ বেশ কয়েকটি ইউনিয়নে এর পরিমাণ অনেক বেশি। এখানে সমন্বিতভাবে অধিক জমিতে সরিষার চাষ করেছেন কৃষক। ফুল এসেছে সেগুলোতে। সেখানে সরিষা ফুলের হলুদ রঙে ঢেকে গেছে দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ। সে ফুলে সারাদিন নেচে-নেচে মধু সংগ্রহ করছে মৌমাছিরাই। আর প্রতিদিন বিকেল হলে সেখানে ভীর করে সৌন্দর্যপিপাসু বিভিন্ন বয়সের মানুষ।

নেওয়াশী ইউনিয়নের মাগুরমুড়া পাড়ের আজিজার রহমান, ধরনীকান্ত, শিংঝাড়ের মফিজুল ইসলাম, আইছুব আলী, ডারার পাড়ের সেলিম, আতাউর রহমান, হাসনাবাদ ইউনিয়নের ন্যাডারপাড় গ্রামের শামছুল হক, শহিদুল ইসলাম, বেরুবাড়ী ইউনিয়নের চর বেরুবাড়ী গ্রামের মফিজুল ইসলাম, চিলমারী গ্রামের আকরাম হোসেন, সন্তোষপুর ইউনিয়নের ধনীগাগলার পনির উদ্দিন মুক্ত, আব্দুল কাদেরসহ বিভিন্ন এলাকার বেশ কয়েকজন কৃষক জানান, এবারে এখন পর্যন্ত সরিষা ক্ষেতের অবস্থা বেশ ভাল। আশা করা যাচ্ছে আশানুরুপ ফলন পাওয়া যাবে। ঠিকঠাক দাম পেলে উৎপাদন খরচ বাদে বেশ মুনাফা হবে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহরিয়ার হোসেন জানান, এ এলাকায় ক্রমে বাড়ছে সরিষার জনপ্রিয়তা। গত বছরের তুলনায় কৃষক এবারে ৯৬০ হেক্টর বেশি জমিতে সরিষার চাষ করেছেন কৃষক। ভাল ফলন পেতে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা ও সমন্বিতভাবে অধিক জমিতে সরিষা চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।

‘সারাদেশ’ : আরও খবর

» পত্নীতলায় বিপুল ভারতীয় নেশাজাতীয় দ্রব্য জব্দ

» সৈয়দপুরে শিক্ষায় আলোকিত করার বাতিঘর এফ ও এইচ স্কুল

সম্প্রতি