দেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি, সেচ ও খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান ভরসা তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প আজ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত তিস্তার গুরুত্বপূর্ণ শাখা নদী নাউতার, বুড়িতিস্তা, কুমলাই ও ধুম পুনঃখনন না করায় এসব নদী বর্তমানে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। চলতি শুকনা মৌসুমেই নদীগুলো বিজ্ঞানসম্মত ও টেকসইভাবে পুনঃখননের জন্য সরকারি মোটা অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ না দেয়া হলে তিস্তা ব্যারেজের সেচ কার্যক্রম পুরোপুরি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা করছেন নদী বিশেষজ্ঞরা।
একসময় খরস্রোতা এসব নদী আজ দখল, ভরাট ও অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে পরিণত হয়েছে প্রায় ‘মরা খালে’। নদীর বুকে জেগে উঠেছে চর, কোথাও আবার নদীর জায়গায় আবাদ হচ্ছে ধান ও সবজি। সরেজমিনে না গেলে বিশ্বাস করাই কঠিন- এগুলো একসময় ছিল প্রবহমান নদী।
নদী বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর দীর্ঘদিনের উদাসীনতা, অপরিকল্পিত খনন ও দুর্নীতির কারণেই নদীগুলো আজ এই করুণ পরিণতির মুখে পড়েছে। অতীতে পুনঃখননের নামে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও বাস্তবে নদীর নাব্যতা ফেরেনি।
পাউবো ডালিয়া কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নাউতার ও ধুম নদীর প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকায় পুনঃখনন কাজ শুরু হয়, যা শেষ হয় ২০২২ সালে। তবে খননকৃত বালু ও মাটি নদীর তীরেই ফেলে রাখায় অল্প সময়ের মধ্যেই তা আবার নদীগর্ভে ফিরে গিয়ে পুরো খনন কার্যক্রম কার্যত ব্যর্থ হয়ে যায়।
নদীতে পানি না থাকায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে অবৈধ বালু ব্যবসায়ী চক্র। স্থানীয় বালু ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান বলেন, ‘স্থানীয় ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীরাই নদী থেকে বালু তুলছে। প্রকাশ্যেই চলছে এই অবৈধ ব্যবসা।’
এর ফলে প্রতিবছর নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হচ্ছে, বাড়ছে ভাঙনের ঝুঁকি, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষিজমি ও বসতভিটা। একই সঙ্গে মারাত্মকভাবে বিঘিœত হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ধুম নদীর ভেতরে বাঁধ দিয়ে আবাদী জমি তৈরি করা হয়েছে, কুমলাই নদীর উৎসমুখে অপরিকল্পিত বাঁধ দিয়ে পানির প্রবাহ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এবং নাউতার নদীজুড়ে চলছে প্রভাবশালীদের দখল। উচ্চ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা দেয়া দ-নীয় অপরাধ হলেও বাস্তবে তার কোনো কার্যকর প্রয়োগ নেই।
‘রিভারাইন পিপল’-এর পরিচালক ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ‘পাউবোর খনন কার্যক্রম অপরিকল্পিত ও অবৈজ্ঞানিক। এভাবে খনন করলে নদীর নাব্যতা কখনোই ফিরবে না। শুকনা মৌসুমে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণসহ বিজ্ঞানসম্মত পুনঃখনন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।’