image
ছবিঃ সংগৃহীত

দশমিনায় অধিকাংশ খালে বাঁধ থাকায় হুমকির মুখে কৃষি জমির উৎপাদন,পরিষদের ছয়ঘর খাল বিলীন

প্রতিনিধি,দশমিনা(পটুয়াখালী)

পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের প্রায় শতাধিক প্রবাহমান খালে পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় ক্রমে ভরাট হয়ে ফসলি জমিতে পরিনত হচ্ছে। খালগুলো অস্তিত্ব রক্ষায় কোন কার্যকরী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। উপজেলা ভূমি অফিসের পর্চা ম্যাপে শতাধিক খাল এখন ফসলি জমি হয়ে যাচ্ছে। ভূমিদস্যুদের লোলুপ দৃষ্টিতে পরে পানি চলাচল ও পয়ঃ নিষ্কাশনের মাধ্যম খালগুলো এখন বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে পৌছানোর অপেক্ষায় রয়েছে। স্থানীয় শালিস বৈঠকে ব্যবহৃত সিএস ম্যাপে উপজেলায় প্রায় দেড় শতাধিক খাল খরস্রোতা থাকলেও বাস্তবে ভূমি খেকোদের থাবায় জলের গতি স্তব্ধ করে দেয়া হয়েছে। খালের স্থানে শোভা পাচ্ছে ক্ষেতে ফসল আর পুকুর খনন করে মাছ চাষাবাদ করা হচ্ছে। এই সব খাল দিয়ে সাগরের পলি বয়ে আসত আর বাড়াতো ফসলি জমির উর্বরতা। শীতকাল তথা শুস্ক মৌসুমে খালগুলো যেন মরা গাঙ্গে পরিনত হয়ে আছে।

উপজেলার বাঁশবাড়িয়ায় তেঁতুলিয়া নদী ও শাখা খালের পানির স্রোতে আসা পলিতে ফসলি জমি উর্বর হতো। বুড়াগৌরাঙ্গ নদী ও শাখা খালের পলি পড়তো দশমিনা, রণগোপালদী ও চরবোরহানের গ্রামগুলোর ফসলি জমিতে। অপরিকল্পিত বাঁধ ও কালভার্ট নির্মাণ করায় খালগুলো ভরাট হয়ে গেছে। ফলে বর্ষা হলে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। আর শুকনো মৌসুমে দেখা দেয় তীব্র পানি সংকট। জলাবদ্ধতা ও পানি সংকটে ফসল ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। উপজেলা পরিষদ ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মধ্যের খালটি আজ ব্যস্ততম আবাসিক এলাকা ও সরকারি দপ্তরের কার্যালয়গুলো শোভা বর্ধণ করছে। শহরের প্রাণ কেন্দ্রে হেটে গেলে কেউ জানবে না এখানে এক সময়ে ছয় ঘর খাল ছিল। লক্ষ্মীপুর গ্রামের জমিদার নিবারন রায়ের নামের খালটি ১০-১৫ হাত পানি থাকা অবস্থায় বন্দোবস্ত দিয়েছে ভূমি অফিস। বন্দোবস্ত প্রাপ্তরা খালটি ভরাট করে ধান চাষাবাদ করছে। কালের স্বাক্ষী এই খাল দিয়ে প্রায় ৩ হাজার একর জমির পানি উঠানামা করত। উপজেলার সদর ইউপির পশ্চিম লক্ষ্মীপুর খাল, আবুতারা খাল, গাজীপুরা খাল, গয়নাঘাট খাল, পূর্ব লক্ষ্মীপুর বাবুর খাল, আলীপুর ইউপির কেয়ার খাল, ইঞ্জিঃ নারায়ণ খাল, শিংবাড়িয়া খাল, গুলবুনিয়ার খাল, রণগোপালদী ইউপির কাটাখাল, নাপ্তার খাল, তালতলার হোতা খাল স্থানীয় প্রভাবশালীরা বন্দোবস্ত নিয়েছে। এসব খাল প্রভাবশালীরা দখল করে মাটি ভরাট ও বাঁধ দিয়েছে। ফলে প্রতি বছর জলাবদ্ধতা ও পানি শূন্যতায় নষ্ট হচ্ছে হাজার হাজার একর ফসলি জমির ফসল। বাঁধ ও অপরিকল্পিত কালভার্ট নির্মাণের ফলে বুড়াগৌরাঙ্গ তেঁতুলিয়া নদী থেকে পলিমাটি আসতে পারছে না। ফলে ফসলি জমির উর্বরশক্তি হ্রাস পাচ্ছে। উপজেলা ৭টি ইউনিয়নের পানি নিষ্কাশনের শতাধিক খালগুলো কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে।

উপজেলার আলীপুরা ইউনিয়নের পূর্ব আলীপুর গ্রামে সরকারি একটি খালের জমি বন্দোবস্ত নিয়ে বাঁধ দেয়ায় প্রায় ১০ হাজার একর আবাদি কৃষি জমির উৎপাদন হুমকির মুখে পড়েছে। বেশ কয়েক বছর যাবত এলাকার প্রান্তিক কৃষকরা লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ফসল উৎপাদন করতে পারছে না।

আলীপুরা ইউনিয়নের পূর্ব আলীপুর গ্রামের ৬ ও ৮ নং ওয়ার্ডের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত খালটি বর্ষায় পানি নিস্কাশন এবং রবিশস্য মৌসুমে সেচ কাজে সুদীর্ঘকাল যাবৎ ব্যবহার করা হয়। প্রভাবশালীরা ঐ সরকারি খালটি বন্দোবস্ত নিয়ে খালের বিভিন্ন অংশে বাঁধ দিয়েছে। ফলে একদিকে রবিশস্য মৌসুমে পানির অভাবে কৃষি জমি ফেটে কৃষকের ফসল নষ্ট হয়। অপরদিকে বর্ষায় আড়াই থেকে তিন ফুট জমে থাকা পানি নিষ্কাশন হতে না পারায় কৃষকের চাষাবাদ ব্যাহত হয়। ভুক্তভোগী কৃষকরা জানান, সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তর ও জন প্রতিনিধিদের কাছে একাধিকবার জানানোর পরেও কোন প্রতিকার মিলছে না। সরকারি ঐ খালটি জনস্বার্থে উম্মুক্ত করে খনন করে পানির প্রবাহধারা ফিরিয়ে আনা একান্ত প্রয়োজন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঐ গ্রামের প্রায় ৯০ ভাগ মানুষই কৃষির উপর নির্ভরশীল। প্রায় দেড় যুগ আগেও বর্ষাকালে ধানসহ রবিশস্য মৌসুমে বিভিন্ন ফসল ফলিয়ে ঐ গ্রামের প্রান্তিক চাষিরা ফলিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে এলাকার কতিপয় প্রভাবশালী ব্যক্তি প্রকৃত ভূমিহীন না হয়েও ভূমিহীন সেজে নিজেদের নামে সরকারি খালটির খাস জমি বন্দোবস্ত নিয়েছে। খালটির বিভিন্ন স্থানে মাটি কেটে বাঁধ দেয়ায় পানি উঠা নামা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছে ঐ গ্রামের চাষিরা। পূর্ব আলীপুরা গ্রামের কৃষক নান্নু মাতুব্বর বলেন,খালটির জমি বন্দোবস্ত নিয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। প্রায় ২২ বছর ধরে ব্যাপক সমস্যায় ভুগছি। একই গ্রামের কৃষক ফজলে আলী হাওলাদার বলেন, যারা বন্দোবস্ত নিয়েছে তারা কেউই ভূমিহীন না। সবাই স্বচ্ছল পরিবার হিসাবে বিবেচিত। বন্দোবস্ত নিয়ে মাটি খনন করে পুকুর কেটে খালের মধ্যে বাঁধ দিয়েছে। এতে পানি উঠানামা বন্ধ হয়ে খালের দুই পাশে প্রায় ১০ হাজার একর কৃষি জমির ক্ষতি হয়েছে। জমিতে পানি প্রবেশ ও নিস্কাশন না হওয়ায় বর্ষাকালে আড়াই থেকে তিন ফুট উচ্চতায় পানি জমে থাকায় চাষাবাদ করতে ব্যাপক কষ্ট হয়। একই গ্রামের কৃষক রেজাউল শরীফ বলেন, গত শীতের ধান কাটা মৌসুমে জমাট পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় আমার আড়াই একর জমির পাঁকা ধান পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। এতে আমার প্রায় ২ লক্ষ টাকার ক্ষতি হয়। অবৈধ বন্দোবস্ত বাতিল করে পুনরায় খালটি খননের মাধ্যমে আশেপাশের সকল কৃষি জমি রক্ষার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্থানীয় কৃষকরা জোর দাবী জানিয়েছে।

‘সারাদেশ’ : আরও খবর

সম্প্রতি