image
ছবিঃ সংগৃহীত

গ্রামের মাটিতে ঋণের ছায়া, কিস্তির ছুরিতে ছিন্নভিন্ন জীবন

জেলা বার্তা পরিবেশক, রাজশাহী

উঠানের এক কোণে উল্টে থাকা ভাতের হাঁড়িটা যেন আজ আর নিছক একটি বাসন নয়, ওটা ক্ষুধার শেষ সাক্ষী। বারবার চোখ চলে যায় সেদিকে, আর মনে পড়ে সেই চিরকুটের কাঁপা কাঁপা লেখা মৃত্যুর পর ঘরে পাওয়া কয়েক লাইনের স্বীকারোক্তি, যেখানে জীবনের সব হিসাব মিটে গেছে ঋণ আর অনাহারে।

দারিদ্র্যের দীর্ঘ ছায়া আর ঋণের চাপা শব্দে রাজশাহীর পবা উপজেলার বামনশিখর গ্রামের একটি পরিবার নিভে যায় এক রাতেই। চারটি প্রাণ, চারটি আলাদা শ্বাস সব মিলিয়ে একটিই আর্তনাদ। যে ঘরটিতে একসময় ভাতের হাঁড়ি চড়ত, শিশুর হাসি ছড়িয়ে পড়ত, সেই ঘরই হয়ে উঠেছে মৃত্যুর নীরব কক্ষ। এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের শেষ নয়; এটি অনাহার, ঋণ আর নিরুপায়তার এমন এক দলিল, যেখানে মানুষের আশা ধীরে ধীরে শুকিয়ে যায়, আর শেষে শব্দহীন হয়ে পড়ে জীবন নিজেই।

ভোর নামলে রাজশাহীর গ্রামগুলোতে সবকিছুই যেন স্বাভাবিক থাকে। মাঠে শিশির ঝরে, চুলায় আগুন জ্বলে, মানুষ কাজে বের হয়। কিন্তু এই স্বাভাবিকতার আড়ালে জমে আছে এক গভীর অস্বস্তি ঋণের ভার। কারও কাঁধে সেই বোঝা এতটাই ভারী যে ঘরের চালের নিচে আর দাঁড়ানো যায় না। কেউ রাতের অন্ধকারে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়, কেউ আত্মগোপনে হারিয়ে যায় মানুষের ভিড় থেকে, আবার কেউ জীবনের সব হিসাব মিটিয়ে চূড়ান্ত নীরবতায় ঢুকে পড়ে। এই ঋণ কেউ নিয়েছিলেন জমিতে ফসল ফলানোর স্বপ্ন নিয়ে, কেউ দোকানের তাক ভরানোর আশায়, কেউ আবার সন্তানের চিকিৎসা কিংবা বিয়ের জন্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই স্বপ্নগুলো সুদের অঙ্কে বদলে গেছে। এক কিস্তি মেটাতে গিয়ে আরেক ঋণ, এক দায় সামলাতে গিয়ে আরেক দায় এভাবেই শুরু হয় অন্তহীন চক্র। শেষ পর্যন্ত ঋণ শুধু টাকা থাকে না, হয়ে ওঠে ভয়, লজ্জা আর অসহায়তার নাম।

রাজশাহীর গ্রামগুলোতে এখন ঋণ শুধু হিসাবের খাতায় নেই, আছে মানুষের চোখে, কথায় আর নীরবতায়। এই সেই নীরবতার গল্প যেখানে ঘর আছে, কিন্তু মানুষ নেই; জীবন আছে, কিন্তু বাঁচার স্বস্তি নেই।

বাঘা, চারঘাট, পবা, মোহনপুর ও তানোর ও রাজশাহী পাঁচ উপজেলার এই বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে এমনই চিত্র মিলেছে। এসব এলাকায় নিম্নমধ্যবিত্ত অন্তত ২৪টি পরিবারের খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, প্রায় প্রতিটি পরিবার একাধিক এনজিও বা ব্যক্তিগত উৎস থেকে ঋণ নিয়েছে। ব্যবসা, কৃষিকাজ, সন্তানের বিয়ে, বিদেশে পাঠানো কিংবা চিকিৎসা কারণ ভিন্ন হলেও পরিণতি প্রায় একই।

গত ১৮ আগস্ট জেলার মোহনপুর উপজেলার ধুরইল গ্রামের পানবরজ থেকে আকবর শাহ (৫০) নামের এক কৃষকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এনজিও ও সুদ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নেয়া ঋণে আধাপাকা ঘর তুলছিলেন তিনি। কিন্তু পানের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় কয়েক মাস ধরে তীব্র মানসিক চাপে ছিলেন।

বাউসা ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধি জানান, তাদের গ্রামে প্রায় সাড়ে ৬০০ পরিবারের মধ্যে সাড়ে ৪০০ পরিবারই কোনো না কোনোভাবে ঋণগ্রস্ত। শুধু এই উপজেলাতেই কাজ করছে অন্তত ২৬টি এনজিও।

চারঘাটের কালুহাটি এলাকায় জুতার কারখানা করে অনেকেই স্বাবলম্বী হলেও অনেকে ঋণ নিয়ে পথে বসেছেন। এমনই একজন আলমগীর হোসেন পরিবার নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন। তার বৃদ্ধ মা-বাবা জানেন না, ছেলে কোথায় আছেন।

একই উপজেলার মুংলি গ্রামের ব্যবসায়ী মাইনুল ইসলাম একতলা পাকা বাড়ি রেখে আত্মগোপনে রয়েছেন। বাড়ির দরজায় এখনও টাঙানো রয়েছে একটি এনজিওর নোটিস অপরিশোধিত ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ২৬ হাজার ৫৮০ টাকা। উজ্জ্বল ভ্যারাইটি স্টোরের মালিক উজ্জ্বল আলীর অবস্থাও প্রায় একই।

পবার একটি মেস থেকে উদ্ধার হওয়া অটোরিকশা চালক শামসুদ্দিনের ঝুলন্ত লাশের পাশে পাওয়া সুইসাইড নোটে লেখা ছিল ‘সুদ দিও না, কিস্তি দিও না।’ ব্যবসায় লোকসান আর মামলার হাজিরার চাপেই এই পথ বেছে নিয়েছিলেন তিনি। বেসরকারি সংস্থা রুরাল আন্ডার প্রিভিলাইজড অ্যান্ড ল্যান্ডলেস ফারমার্স অর্গানাইজেশনের পরিচালক আফজাল হোসেন মনে করেন, এসব ঘটনার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে এনজিওগুলোর ‘টার্গেট ঋণ’। তার ভাষায়, লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে গিয়ে অনেক সময় ফিজিবিলিটি যাচাই না করেই ঋণ দেয়া হচ্ছে। গ্রাহকের অন্য কোথাও ঋণ আছে কি না, সেটিও দেখা হচ্ছে না।

শাপলা গগ্রম উন্নয়ন সংস্থার সহকারী পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি) পুরোপুরি চালু হলে একজন গ্রাহকের জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে সব ঋণের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হবে। এখন অনেক সময় তরুণ কর্মকর্তারা তাড়াহুড়া করে ঋণ দিয়ে ফেলেন।

‘সারাদেশ’ : আরও খবর

সম্প্রতি