image

বদলাচ্ছে মাটির হিসাব, মিশ্র চাষে লাভবান হচ্ছেন কৃষক

জেলা বার্তা পরিবেশক, রাজশাহী

নীরবতার ভেতর বদলে যাচ্ছে কৃষকের জীবন। একসময় যে মাঠে শুধু এক ফসলের অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা আর লোকসানের দীর্ঘশ্বাস জমে থাকত আজ সেখানে একসঙ্গে জন্ম নিচ্ছে স্বপ্ন, সবুজ আর সম্ভাবনা। জলবায়ু পরিবর্তন, খরার চাপ আর এক ফসলি চাষের ক্ষতির সঙ্গে লড়তে লড়তে রাজশাহীর কৃষক বুঝে নিয়েছেন, বাঁচার পথ বদলাতে হবে। সেই বদলের নামই মিশ্র চাষ যেখানে মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক আরও গভীর, আরও বুদ্ধিদীপ্ত।

এটি শুধু চাষাবাদের কৌশল নয়, এটি এক ধরনের আর্থসামাজিক রূপান্তর। আমবাগানের ছায়ায় সবজির সবুজ হাসি, ড্রাগন ফলের মাচায় শ্রমের ঘাম, মাল্টা বাগানে নতুন জীবিকার গন্ধসব মিলিয়ে বদলে যাচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতির ভাষা। কৃষক আর শুধু উৎপাদক নন, তিনি এখন উদ্যোক্তা; মাঠ আর শুধু জমি নয়, হয়ে উঠছে সম্ভাবনার পাঠশালা। রাজশাহীর এই মিশ্র চাষ তাই নিছক কৃষি খবর নয়, এক আবেগঘন পরিবর্তনের গল্প, যেখানে মাটি শেখাচ্ছে টিকে থাকার নতুন অর্থনীতি।

বর্তমানে রাজশাহী অঞ্চলে আম, মাল্টা, লেবু, পেয়ারা ও ড্রাগন ফলের মতো অর্থকরী ফলগাছের সঙ্গে শসা, বেগুন, পেঁপে, মুলা, বরবটি, ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাল শাক, মরিচ, পটল, লাউ ও করলার মতো নানা সবজি মিশ্রভাবে চাষ করা হচ্ছে। একই জমিতে একাধিক ফসল উৎপাদনের ফলে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে এবং কৃষকের উৎপাদন ঝুঁকিও কমছে।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আধুনিক সেচ ব্যবস্থা, সঠিক ছাঁটাই, সার ব্যবস্থাপনা এবং রোগবালাই দমনে প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতি ব্যবহারের কারণে মিশ্র চাষে উৎপাদনশীলতা উল্যেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে ফলের গুণগত মান বজায় রেখেই অতিরিক্ত ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে।

চারঘাট উপজেলার কৃষক জামাল হোসেন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গত কয়েক বছর ধরে শুধু ধান চাষ করে অনেক কৃষকই ক্ষতির মুখে পড়ছেন। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তারা এখন আমবাগানের সঙ্গে ধান, পেঁয়াজ, রসুন, বেগুন, সরিষা, হলুদ ও পেঁপে চাষ করছেন।

তিনি বলেন, মিশ্র ফসল চাষে একদিকে মোট উৎপাদন বাড়ছে, অন্যদিকে মাটির স্বাস্থ্য ভালো থাকছে। আমের ফলন বা গুণগত মানের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ে না। নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি জানান, তার আট বিঘার আমবাগানে মৌসুমি ফসলের মিশ্র চাষ করে তিনি নিয়মিত বাড়তি আয় পাচ্ছেন।

পবা উপজেলার হুজরিপাড়া গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা প্রকৌশলী সরওয়ার জাহান, ২০২০ সালে নয় বিঘা জমিতে মাল্টার বাগান গড়ে তোলেন। চলতি মৌসুমে তিনি একই জমিতে ফুলকপি, বাঁধাকপি ও কাঁচা মরিচ চাষ করেছেন। তিনি জানান, মরিচ বিক্রি করে ইতোমধ্যে প্রায় ৪৫ হাজার টাকা এবং মাল্টা বিক্রি করে প্রায় ৬০ হাজার টাকা আয় করেছেন। ফুলকপি ও বাঁধাকপিও ভালো দামে বিক্রি হচ্ছে। ফসল কাটার পর তিনি কুমড়া ও শসার চারা রোপণের পরিকল্পনা করেছেন।

একই উপজেলার পুঠিয়াপাড়া গ্রামের মাদ্রাসা শিক্ষক মোফাক্কার হোসেন তার তিন বিঘার ড্রাগন ফলের বাগানে ফুলকপি ও বাঁধাকপি চাষ করে বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়েছেন। তিনি বলেন, ড্রাগন ফলের সঙ্গে সবজি চাষ করে আমি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছি। এই পদ্ধতি আমার জীবনে বড় পরিবর্তন এনেছে।

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, রাজশাহীর উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, মিশ্র ফসল চাষ বর্তমান কৃষি ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি পদ্ধতি। এতে কৃষকরা কম সময়ে একই জমি থেকে একাধিক ফসল উৎপাদন করতে পারছেন। ফল ও সবজির মিশ্র চাষ মাটির উর্বরতা রক্ষা করে এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি নিশ্চিত করে। তিনি জানান, চলতি মৌসুমে সরকারি হিসাবে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে মিশ্র পদ্ধতিতে সবজি চাষ হয়েছে এবং এই পরিমাণ প্রতি বছরই বাড়ছে।

পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এমএ মান্নান বলেন, আমাদের কৃষকরা এখন অনেক বেশি সচেতন ও প্রযুক্তিনির্ভর হচ্ছেন। মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও প্রদর্শনী প্লটের মাধ্যমে আমরা কৃষকদের মিশ্র চাষে উদ্বুদ্ধ করছি। এর ফলে উৎপাদন ব্যয় কমছে এবং লাভের পরিমাণ বাড়ছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, মিশ্র চাষ শুধু কৃষকের আয় বৃদ্ধি করছে না, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিতে অতিরিক্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে। কৃষক, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা সবার জন্যই এটি একটি লাভজনক, টেকসই ও ভবিষ্যৎমুখী কৃষি ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

‘সারাদেশ’ : আরও খবর

সম্প্রতি