image
সরিষা থেকে মধু সংগ্রহ করছেন আক্কেলপুরের এক বাসিন্দা -সংবাদ

সরিষার সুবাসে মুখর আক্কেলপুর, মাঠে মাঠে মৌ চাষের ব্যস্ততা

প্রতিনিধি, আক্কেলপুর (জয়পুরহাট)

জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌরসভার মাঠে মাঠে এখন সরিষার হলুদ ফুলের অপরূপ দৃশ্য। পুরো মাঠ যেন ঢেকে আছে সুন্দর এক হলুদের চাদরে। তাই এই সুযোগে মৌ চাষিরাও ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন সরিষার খেত থেকে মধু সংগ্রহে। উপজেলার ভান্ডারীপাড়া, কেসের মোড়, ইসমাইলপুর, জাফরপুর এলাকায় ফসলের মাঠ ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। ফসলের জমির পাশে পোষা মৌমাছির শতশত বাক্স নিয়ে হাজির হয়েছেন মৌয়ালরা। ওই সব বাক্স থেকে হাজার হাজার মৌমাছি উড়ে গিয়ে মধু সংগ্রহে ঘুরে বেড়াচ্ছে সরিষা ফুলের মাঠে।

উপজেলা কৃষি দপ্তর থেকে জানা গেছে, এ বছর উপজেলায় ৩শ’ ৭৫টি মৌবক্স বসানো হয়েছে। এসব বাক্স থেকে ৫ হাজার ১০০ কেজি মুধু সংগ্রহের লক্ষ্য মাত্রা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ৬শ’ ২০ কেজি মধু সংগ্রহ হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে লক্ষ্য মাত্রার বেশি মধু অর্জিত হবে। কৃষি দপ্তর আরও বলছে, এসব মধু স্বাস্থ্য সম্মত। তারা নিয়মিত পরিদর্শনও করেছেন। প্রতি কেজি মধু ৪শ’ টাকা বিক্রিও হচ্ছে।

উপজেলার রুকিন্দীপুর ইউনিয়েনের ইসমাইলপুর নামক স্থানে সরিষা ফুল থেকে মধু আহরণের পদ্ধতি সম্পর্কে নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা খুরশিদ আলম জানান, মধু সংগ্রহের জন্য স্টিল ও কাঠ দিয়ে বিশেষভাবে তৈরি করা হয় বাক্স। যার ওপরের অংশটা কালো রঙের পলিথিন ও চট দিয়ে মোড়ানো থাকে। বাক্সের ভেতরে কাঠের তৈরি সাতটি ফ্রেমের সঙ্গে মোম দিয়ে বানানো বিশেষ কায়দায় লাগানো থাকে এক ধরনের সিট। পরবর্তীতে বাক্সগুলো সরিষা খেতের পাশে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়।

পাশাপাশি বাক্সগুলোর ভেতরে দেয়া হয় রানি মৌমাছি। যাকে ঘিরে আনাগোনা করে হাজারো পুরুষ মৌমাছি। রাণীর আকর্ষণে সরিষা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে মৌমাছিরা। একটি রানি মৌমাছির বিপরীতে প্রায় ৩-৪ হাজারের মতো পুরুষ মৌমাছি থাকে একেকটি বাক্সে।

মৌ চাষি আক্কেলপুর পৌরসভার হাস্তাবসন্তপুর গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, আমরা সরিষা খেত থেকে বছরে ৩-৪ মাস পর্যন্ত মধু সংগ্রহ করে থাকি। জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সরিষা থেকে মধু সংগ্রহের উপযুক্ত সময়। আকারভেদে একটি বাক্সে ২০-৪০ কেজি পর্যন্ত মধু পাওয়া যায়। প্রতি কেজি মধু বিক্রি করা হয় ৪শ’ টাকা। মধু মূলত পাইকারি পর্যায়ে বেশি বিক্রি হয়। বিভিন্ন অনলাইন পার্টি ফোনের মাধ্যমে অর্ডার দিয়ে অগ্রিম টাকা পরিশোধ করে। এর আগে নওগাঁতে দুইটি মাঠে কাজ শেষ করে এখানে এসেছি। বর্তমানে আমাদের সঙ্গে তিনজন কর্মচারী কাজ করছেন। তিনি জানান, আমি উপজেলার ভান্ডারীপাড় নামক স্থানে প্রায় ৪০ হেক্টর সরিষার খেতের ওপর এক মাস মধু আহরণ করে সব খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ২ লক্ষ টাকা আয় হতে পারে। এবার ১শ’ ২০টি বাক্স বসিয়েছি। গত সপ্তাহে সবগুলো বাক্স থেকে মধু সংগ্রহ করেছি প্রায় সাত মণ। প্রতি মণ মধু বিক্রি করেছি ১৬ হাজার টাকায়। তবে এবার আবহাওয়া খারাপ, পশ্চিমা বাসে তেমন মধু সংগ্রহ করতে পারছি না। এখানে আমিসহ ২জন সার্বক্ষণিক তদারকি করে থাকি। আমি ১৪ বছর ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে মধু আহরণ করে আসছি। এসব মধু দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ক্রেতারা পাইকারি ও খুচরা নিয়ে থাকেন।

ফুলের মৌসুম না থাকলে মৌমাছিকে চিনি খাওয়াতে হয়। সরিষার মৌসুম শেষে এই মাঠের কাজ শেষ করে আমরা শরীয়তপুর যাব। এরপর দিনাজপুরের বিরলে লিচু বাগানে কাজ করব। সেখানে কাজ শেষ হলে ঠাকুরগাঁওয়ে গিয়ে মিষ্টি কদু ও কালোজিরা থেকে মধু সংগ্রহ করা হবে। আর যখন কোনো মৌসুম থাকে না, তখন মৌমাছিকে টিকিয়ে রাখতে নিয়মিত চিনি খাওয়াতে হয়।

জামালগঞ্জ থেকে আসার মধু ক্রেতা মো. হাবিবুর রহমান শাওন বলেন, আমি আমার মেয়েদের নিয়ে ঘুরতে বের হয়েছি। রাস্তার পাশে সষিরা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ দেখে দাঁড়িয়েছি। এক কেজি মধু ৪শ’ টাকা নিয়েছি। আসা করছি মধুগুলো ভালো হবে।

উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. ইমরান হোসেন বলেন, ‘উপজেলায় ১৮শ’ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। সরিষা খেতের পাশাপাশি উপজেলার চারটি স্থানে প্রায় ৩৫০টির বেশি মৌমবক্স স্থাপন করা হয়েছে। সেসব মৌমবক্স থেকে মধু আহরণ শুরু হয়েছে। এ বছর মধু সংগ্রহে আমাদের লক্ষ্য মাত্রা রয়েছে ৫ হাজার কেজি। আমরা সব সময় পরামর্শ দিচ্ছি যেন মধুটি স্বাস্থ্য সম্মত হয়। মৌমাছির চাষ হলে সরিষার ফলন ১০ ভাগ বেড়ে যায়। তাই পরাগায়ণের মাধ্যমে সরিষার ফলনও ভালো হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সরিষা খেত থেকে বিনা খরচে মধু সংগ্রহ লাভজনক ব্যবসা। এতে মৌমাছি ব্যবসায়ী যেমন একদিকে মধু বিক্রি করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন, অন্যদিকে খেতে মধু চাষ করায় সরিষার ফলনও বাড়ছে। এতে উপজেলায় সরিষা চাষ যেমন বেড়েছে পাশাপাশি মধু চাষের আগ্রহও বাড়ছে।’

‘সারাদেশ’ : আরও খবর

» সিলেটে বিয়েতে এসে হাতি খাদে, উদ্ধার করলো ফায়ার সার্ভিস

» নোয়াখালীতে যুবককে পিটিয়ে হত্যা, ডাকাত আখ্যা দিয়ে মিষ্টি বিতরণ

সম্প্রতি