image
গাইবান্ধা : নারী শ্রমিকরা কাজে ব্যস্ত -সংবাদ

উত্তরাঞ্চলে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও পুরুষের অর্ধেক মজুরি পান নারীরা

প্রতিনিধি, গাইবান্ধা

মাথার ওপর কাঠফাটা রোদ, পায়ে তপ্ত মাটি, কিংবা হাড় কাঁপানো শীত- কোনোকিছুই যেন দমাতে পারে না তাদের। উত্তরাঞ্চলের গ্রাম-গঞ্জের মেঠোপথ থেকে ফসলের মাঠ কিংবা নির্মাণাধীন প্রকল্প, সবখানেই এখন নারীদের সরব উপস্থিতি। জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার তাগিদে শ্রমে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও কমেনি বঞ্চনা। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও দিনশেষে পুরুষ শ্রমিকের চেয়ে অনেক কম মজুরি নিয়ে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে তাদের।

উত্তরাঞ্চলের গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, রংপুর, লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, নীলফামারী ও দিনাজপুরের বিভিন্ন এলাকায় এটি এখন নিত্যদিনের চিত্র। বিশেষ করে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার, মাটি কাটা এবং কৃষি কাজে নারীদের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো।

সরেজমিন দেখা যায়, একজন পুরুষ শ্রমিক সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত মাটি কাটার কাজ করে মজুরি পাচ্ছেন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। অথচ একই সময়ে, সমান বা তার চেয়ে বেশি বোঝা বহন করেও একজন নারী শ্রমিক পাচ্ছেন মাত্র ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। অর্থাৎ, লিঙ্গভেদে দিনপ্রতি মজুরির ব্যবধান প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ টাকা।

রংপুরের পীরগাছা উপজেলার তাম্বুলপুর গ্রামের নারী শ্রমিক জরিনা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, হামরা বেটা মানুষগুলার সাথে সমান কাজ করি। ওগোর থাইকা কম বোঝা টানি না। কিন্তু দিন শ্যাষে ওগো দেয় ৫০০ টাকা, আর হামাগো হাতে ধরান ৩০০ টাকা। প্রতিবাদ করলে কয়—পোষাইলে করো, নাইলে যাও। পেটের যায়ে এই অবিচার মানি নিয়েই কাজ করি।

একই অভিযোগ গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার দিঘলকান্দি চরের মালেকা খাতুনের। তিনি বলেন, পুরুষদের সাথে পাল্লা দিয়ে একই জমিতে মরিচ তোলার কাজ করি। কাজের দিক থেকে আমরা কোনো অংশেই কম নই, অথচ তারা পায় ৫০০ টাকা আর আমাদের দেয় ৩০০ টাকা। আক্ষেপ করে তিনি আরও বলেন, তাও তো কাজ করে কিছু টাকা পাচ্ছি, এটাই বা কম কী!

বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার তথ্য ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও অকৃষি খাতে শ্রম দেওয়া নারীদের প্রায় ৯০ শতাংশই মজুরি বৈষম্যের শিকার। যেখানে পুরুষের গড় মজুরি ৫০০-৬০০ টাকা, সেখানে নারীর গড় মজুরি জুটছে মাত্র ৩০০-৪০০ টাকা।

উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ও গণউন্নয়ন কেন্দ্রের নির্বাহী প্রধান এম. আবদুস্ সালাম জানান, উত্তরাঞ্চলে দারিদ্র্যের হার বেশি হওয়ায় নারীরা অনেকটা বাধ্য হয়েই কম মজুরিতে কাজ নেন। মালিকপক্ষ নারীর এই অসহায়ত্ব এবং দর কষাকষির ক্ষমতার অভাবকে পুঁজি করে মুনাফা লুটছে।

মজুরি কম দেয়ার যুক্তিতে ইটভাটার মালিক আরিফ হোসেন দাবি করেন, নারীদের শারীরিক সক্ষমতা পুরুষদের চেয়ে কম, তাই তাদের মজুরিও কম। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। মাটি বহন বা ফসল তোলার মতো কাজে নারীরা পুরুষদের চেয়ে পিছিয়ে তো নেই-ই, বরং অনেক ক্ষেত্রে তারা কাজের প্রতি বেশি যত্নশীল।

রংপুরের সমাজকর্মী কে এম আলী সম্রাট বলেন, নারীর শ্রমে অংশগ্রহণের হার বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু সমকাজে সমমজুরি নিশ্চিত না করা শ্রম আইনের লঙ্ঘন এবং মানবাধিকার পরিপন্থি। উত্তরাঞ্চলের নারীরা মূলত অসংগঠিত খাতে কাজ করেন বলে তাদের কোনো ‘ট্রেড ইউনিয়ন’ বা জোরালো কণ্ঠস্বর নেই। প্রশাসনের উচিত স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে ন্যূনতম মজুরি কাঠামো বাস্তবায়ন তদারকি করা।

উত্তরের জনপদে মঙ্গা হয়তো আগের মতো নেই, কিন্তু শ্রমজীবী নারীদের ভাগ্যের চাকা খুব একটা ঘোরেনি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা।

উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল অংশগ্রহণ বৃদ্ধিই নয়, নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হলে ‘সমকাজে সমমজুরি’ নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

সম্প্রতি