পাহাড়ি অঞ্চলে নির্বিচারে বন উজাড়, পাহাড় কর্তন ও অবাধ পাথর উত্তোলনের ফলে মারাত্মক পরিবেশগত সংকটে পড়েছে স্থানীয় নদ-নদী। একসময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এবং জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এসব নদী এখন অস্তিত্ব সংকটে। দীর্ঘদিন ধরে নদী খনন না হওয়ায় পাহাড় থেকে নেমে আসা পলি ও বালিতে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। এতে নদীর স্বাভাবিক গভীরতা কমে গেছে এবং অনেক স্থানে ছোট-বড় চর জেগে উঠেছে। ফলে নদী তার নাব্যতা হারিয়ে ফেলছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বন উজাড়ের কারণে প্রাকৃতিকভাবে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ক্ষমতা কমে গেছে। আগে পাহাড়ের গাছপালা মাটিকে শক্ত করে ধরে রাখত এবং অতিরিক্ত পানি শোষণ করত। এখন বন উজাড় হওয়ায় বৃষ্টির পানি সরাসরি পাহাড় বেয়ে নেমে আসছে। এতে পাহাড় থেকে বিপুল পরিমাণ পলি ও বালি নদীতে এসে জমা হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে ঢলের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
এলাকায় ঝিরি ও ঝর্ণা থেকে অবাধে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে ধীরে ধীরে পানির প্রাকৃতিক উৎসগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। একসময় যেসব ঝরনা সারা বছর পানি দিত, এখন সেগুলোর অনেকগুলোই প্রায় নিঃশেষ হয়ে গেছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, পাথর উত্তোলনের সময় ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করায় আশপাশের গাছপালাও নির্বিচারে কেটে ফেলা হচ্ছে। ফলে পাহাড়ের মাটি দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং নদীর পাড় ভাঙনের ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যাচ্ছে।পাথর উত্তোলন ও গাছ নিধনের কারণে নদীর তীরবর্তী এলাকায় ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। অনেক স্থানে বসতবাড়ি নদীতে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। স্থানীয়রা জানান, প্রতি বছর বর্ষা এলেই নদীর পাড় ভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটাতে হয় তাদের।
নাব্যতা সংকটে বন্ধ নৌ চলাচল নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় গভীরতা কমেছে। ফলে নৌকা ও ছোট ট্রলার চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। একসময় এই নদীপথেই মানুষজন বাজারে যেত, কৃষিপণ্য পরিবহন করত এবং এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় যাতায়াত করত।
এখন নাব্যতা হারিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এতে জেলে ও নদী নির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।একজন জেলে বলেন, আগে নদীতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। এখন নদী শুকিয়ে যাওয়ায় মাছও কমে গেছে। সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। কৃষিতে দেখা দিয়েছে সেচ সংকট নদীতে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় সেচের জন্য পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে কৃষকরা সময়মতো জমিতে পানি দিতে পারছেন না। এতে ধান, সবজি ও অন্যান্য ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে চাষাবাদ কমিয়ে দিচ্ছেন। এর প্রভাব পড়েছে পুরো এলাকার খাদ্য উৎপাদন ও অর্থনীতিতে। স্থানীয়দের মতে, নদীর ওপর নির্ভরশীল প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ বর্তমানে পানীয় জলসহ দৈনন্দিন প্রয়োজনে চরম সংকটে পড়েছেন। আগে নদীর পানি ব্যবহার করেই তারা রান্না, গোসল ও গৃহস্থালি কাজ করতেন। এখন নদী শুকিয়ে যাওয়ায় নিরাপদ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। দূর থেকে পানি আনতে হচ্ছে অনেক পরিবারকে। এক গৃহবধূ জানান, ‘আগে ঘরের পাশের নদী থেকেই পানি নিতাম। এখন সেই নদীতে পানি নেই। দূরের টিউবওয়েল থেকে পানি আনতে হয়। এতে সময় ও কষ্ট দুটোই বাড়ছে।’
নদী শুকিয়ে যাওয়ায় জলজ প্রাণী ও মাছের আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে। ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে নানা প্রজাতির মাছ ও জলজ উদ্ভিদ। এতে পুরো এলাকার পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে নদী শুকিয়ে গেলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি নদীভাঙনের কারণে বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সড়কসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক পরিবার ইতোমধ্যে বাড়িঘর হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়ছে।স্থানীয়দের দাবি, নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত ড্রেজিং কার্যক্রম শুরু করতে হবে। পাশাপাশি নদীভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় বাঁধ ও প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণ করা জরুরি। তবে দীর্ঘদিন ধরে এসব কার্যক্রম বাস্তবায়ন না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা।এছাড়া বনাঞ্চল রক্ষা, অবৈধ পাহাড় কাটা ও পাথর উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল। তাদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে এবং নদী সম্পূর্ণভাবে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। স্থানীয় পরিবেশকর্মীরা বলেন, নদী শুধু পানি নয়, এটি আমাদের জীবন, জীবিকা ও সংস্কৃতির অংশ। নদী বাঁচাতে হলে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। নাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।
এদিকে লামা বাজারের একজন ব্যবসায়ী জানান, পাহাড় ও ঝিরি খুঁড়ে অবাধে পাথর উত্তোলনের কারণে ঝিরি থেকে পানিরপ্রবাহ কমে গেছে। নদীর তলদেশ ভরাট হওয়ায় অল্প বৃষ্টিতে পাহাড়ি ঢলে উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। মাতামুহুরী নদী নাব্যতা সংকটের কারণে প্রতি বছর গড়ে ৪/৫ বার ভয়াবহ বন্যায় লামা, আলীকদম উপজেলার বিস্তৃীর্ণ অঞ্চল ও জনবসতির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বর্ষা শেষ হতে না হতেই নদীর বুকে বুকে জেগে উঠবে অসংখ্য চর। নদীর নাব্যতা হ্রাসের ফলে নদীকে ঘিরে গড়ে উঠা জনবসতির চরম কষ্ট দেখা দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক: সম্পর্কের ‘সোনালি অধ্যায়’ ফেরাতে চায় ব্রিটেন ও চীন
অর্থ-বাণিজ্য: বাংলাদেশ থেকে ওষুধ আমদানি করবে আফগানিস্তান
অর্থ-বাণিজ্য: স্বর্ণের ভরি আড়াই লাখ টাকা ছাড়ালো