নরসিংদী জেলার সবচেয়ে ছোট উপজেলাটির নাম পলাশ। পলাশ-ঘোড়াশাল শিল্পাঞ্চল নামে পলাশ নামটি এখন দেশ ছাড়িয়ে পরিচিত আন্তর্জাতিক পরিসরে। আয়তনে ৯৪.৪৩ বর্গকিলোমিটার, জনসংখ্যা আড়াই লাখের মতো। বয়োবৃদ্ধদের মতে এই অঞ্চলে আগে প্রচুর পলাশফুল ফুটতো। পলাশফুল হতেই জনশ্রুতি এই উপজেলার নামকরণ হয় পলাশ।
শান্ত স্নিগ্ধ শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব দিকে পলাশের অবস্থান। শিল্পাঞ্চল গড়ে ওঠার আগে পলাশে মানুষ ছিল কৃষি ও হাতে বোনা তাঁতের জন্য প্রসিদ্ধ। বিশেষ করে আমন আউশ বোরো ধানের ব্যপক চাষ হতো পলাশে। এছাড়া জিনারদীর রসালো মিষ্টি জলডুগী আনারস ও লটকন তো দেশজুড়ে পরিচিত। চরসিন্দুরের অমৃত সাগর, সবরি, কবরি, চাপা কলার জন্য প্রসিদ্ধ। শীতকালে বাহারি রবিশস্য এ অঞ্চলের কৃষকরা চাষ করে যাচ্ছে।
ষাটের দশকের শুরুতেই গোড়াপত্তন ঘটে শিল্প কারখানার। ১৯৬৩ সালে কো-অপারেটিভ জুট মিল ঘোড়াশালের জমিদার বাড়ির বাংলাদেশের খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব, দৈনিক সংবাদ-এর সম্পাদক, প্রগতিশীল রাজনীতির ধারক-বাহক, সাধারণ জনগণের আশ্রয়, সাবেক সংসদ সদস্য- আহমদুল কবিরের (মনু মিয়া) হাত ধরেই পলাশে শিল্পকারখানার যাত্রা শুরু হয়। এরপর একে একে গড়ে ওঠে আরো ৪টি জুট মিল; ঘোড়াশাল সারকারখানা, পলাশ সারকারখানা, ঘোড়াশাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র, প্রাণের প্রায় ছয়টি ফ্যাক্টরি, স্যামরি ডাইং ফ্যাক্টরি, ওমেরা গ্যাস ফ্যাক্টরিসহ আরও অনেক কলকারখানা। যদিও এখন দুটি সারকারখানা একত্রে এশিয়া অন্যতম বৃহৎ পলাশ-ঘোড়াশাল সারকারখানা নামে পরিচিত। তারপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বর্তমানে পলাশ-ঘোড়াশাল শিল্পাঞ্চলে ছোটবড় প্রায়ই ১২৮টি শিল্প-কারখানা রয়েছে। যেখানে দেশ-বিদেশের লক্ষাধিক নারী-পুরুষ চাকরি করছে। অনেক পণ্য রপ্তানি হচ্ছে বিদেশে।
আশির দশক পর্যন্ত ঘোড়াশালের কয়েকটি গ্রামে ছিল শতশত হাতে বোনার তাঁতকল। বর্তমানে তাঁতকল আর নেই বললেই চলে। তবে পলাশের ডাংগা ইউনিয়নে এখনো তাঁতকলের প্রাধান্য রয়েছে। পলাশের জিনারদী, চরসিন্দুর, গজারিয়া ও ডাংগা কৃষিজাত ফসলের পাশাপাশি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মোড়া।
পলাশ উপজেলার শিক্ষাব্যবস্থার রয়েছে দেশজুড়ে খ্যাতি। এখানে রয়েছে ৬৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দুটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়সহ মোট ২৪টি উচ্চ বিদ্যালয়, বড় মাদ্রাসা ১০টি, এছাড়া প্রায়ই প্রতিটি গ্রামেই রয়েছে মাদ্রাসা ও কেজি স্কুল। কলেজের মধ্যে পলাশ শিল্পাঞ্চল সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, পলাশ রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ, পলাশ থানা সেন্ট্রাল কলেজ, ঘোড়াশাল মুসাবিন বিন হেকিম ডিগ্রি কলেজ, শহীদ স্মৃতি ডিগ্রি কলেজ চরসিন্দুর, ডা. নজরুল বিন নূর মহসীন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ইউরিয়া সারকারখানা স্কুল অ্যান্ড কলেজ। প্রায়ই সবগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফলও মনকাড়া শিক্ষার মান ও পরিবেশও শিক্ষা বান্ধব।
চিকিৎসায়ও পিছিয়ে নেই পলাশ উপজেলা। সরকারিভাবে রয়েছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্ল্যাক্স, বেসরকারিভাবে আছে তারামিয়া ম্যামোরিয়াল হাসপাতাল, রৌশন জেনারেল (প্রা.) হাসপাতাল, আনোয়ারা হাসপাতাল, সান হেলথ্ কেয়ার হাসপাতাল, ছলিমউল্লাহ হাসপাতাল, আনুমিজান হাসপাতাল। অন্যদিকে রয়েছেÑ অনামিকা ডায়াগনস্টিক, মেডিচ্যাক ডায়াগনস্টিক, মুক্তিযোদ্ধা ডায়াগনস্টিক, আহমেদ ডায়াগনস্টিক, ডি-ডক্টরস্সহ প্রায়ই একডজন ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এসবই রয়েছে পলাশের চারটি ইউনিয়ন ও ঘোড়াশাল পৌরসভার ভেতরে।
এদিকে চরসিন্দুর ইউনিয়ন, ঘোড়াশাল পৌরসভা ও ডাংগায় শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে শতাধিক কলকারখানা। পলাশের এত সুনাম ও সমৃদ্ধি থাকা সত্ত্বেও পলাশ-ঘোড়াশাল হতে ঢাকা যাওয়ার নেই কোন বাস সার্ভিস। রেলপথই একমাত্র ভরসা। এমনকি পলাশ বা ঘোড়াশাল হতে সড়ক পথে জেলা শহর নরসিংদী সরাসরি যাতায়াতে নেই কোন বাস সার্ভিস। সাধারণ জনগণ ভেঙে ভেঙে জেলা শহরে যাতায়াত করে।
আন্তর্জাতিক: সম্পর্কের ‘সোনালি অধ্যায়’ ফেরাতে চায় ব্রিটেন ও চীন
অর্থ-বাণিজ্য: বাংলাদেশ থেকে ওষুধ আমদানি করবে আফগানিস্তান