আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’তে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদমর্যাদা) আলী রীয়াজ বলেছেন, ‘অনেকেই জিজ্ঞেস করেন, “হ্যাঁ”র প্রার্থী কে? আমি বলি, “হ্যাঁ”র প্রার্থী আপনি, আমি, আমরা সবাই। কারণ “হ্যাঁ” আমাদের উপহার দেবে একটি গণতান্ত্রিক-মানবিক বাংলাদেশ। যেটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা।’
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে খুলনা বিভাগীয় অডিটোরিয়ামে আসন্ন গণভোট ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণের লক্ষ্যে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মোখতার আহমেদ সভায় সভাপতিত্ব করেন।
সভায় আলী রীয়াজ বলেন, ‘আসন্ন গণভোটে “হ্যাঁ”তে সিল দিলে নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরোজা খুলে যাবে। “হ্যাঁ”তে আপনি সিল দিন, আপনার পরিচিত সবাইকে সিল দিতে উদ্বুদ্ধ করুন এবং তাদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসুন। দেশ পাল্টে দিন। ফ্যাসিবাদের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত এ জাতি আর কোনও স্বৈরশাসন, দুঃশাসন চায় না। তারা একটি আলোকিত আগামী গড়তে চায়, নতুন দিন আনতে চায়; সেদিন হবে সাম্য, সমতা আর আনন্দের। যেখানে কোনও কোনও অন্তরাত্মা কাঁপানো বাহিনীর হাতে গুম হওয়ার ভয় থাকবে না, গায়েবি মামলায় গ্রেফতার হওয়ার আতঙ্ক থাকবে না, যেদিনের স্বপ্ন দেখেছিল আমাদের মহান মুক্তিযোদ্ধারা, যেদিন আনতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অকাতরে জীবন দিয়েছে আমাদের ছাত্র-জনতা।’
তিনি বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান জাতির ইতিহাসে এক অসাধারণ অর্জন। এই অভ্যুত্থান অপ্রত্যাশিতভাবে দেশের জীবনে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছে।’ এই লক্ষ্য সামনে রেখে ইতোমধ্যে বেশ কিছু সংস্কার করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তবে এসব উদ্যোগের পাশাপাশি আরও গভীর ও সুদূরপ্রসারী সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে রয়েছে জানিয়ে আলী রীয়াজ বলেন, ‘সে কারণেই দেশের সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই সনদ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই সনদ বাস্তবায়নের জন্য জনগণের সরাসরি সম্মতি প্রয়োজন, আর সে উদ্দেশ্যেই গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে।’ তিনি গণভোটে অংশ নিয়ে ‘হ্যাঁ’তে রায় দিতে সবার প্রতি আহ্বান জানান।
‘হ্যাঁ’- ভোটের অর্থ ও তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ এ সহকারী বলেন, ‘এর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশন গঠনে সরকার ও বিরোধীদল একসঙ্গে কাজ করবে। ক্ষমতাসীনরা ইচ্ছেমতো সংবিধান পরিবর্তন করতে পারবে না; গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পরিবর্তনের জন্য জনগণের সম্মতি নিতে হবে। বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার এবং গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হবেন। একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। বিচার ব্যবস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করবে, যার ফলে বিচারের বাণী আর নীরবে-নিভৃতে কাঁদবে না।’
বিশেষ অতিথি প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, ‘গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হলে ফ্যাসিবাদের পথ বন্ধ হয়ে যাবে; যে পথ আমাদের সংবিধানের দুর্বলতায় তৈরি হয়েছে। গণভোটের মধ্য দিয়ে আমাদের পূর্বসূরিদের পুরোনো স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে। কী ছিল সেই স্বপ্ন? ৫৪ বছর আগে আমাদের পূর্বসূরিরা মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় যে স্বাধীন দেশের স্বপ্নে শপথ নিয়েছিলেন, সেই স্বপ্ন ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা আর সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে নতুন স্বদেশ নির্মিত হবে; যেখানে কোনও বৈষম্য, বঞ্চনা আর শোষণ থাকবে না।’
তিনি অর্থনৈতিক লুটের সাম্রাজ্যের চির উৎখাতের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে গঠিত কমিশন রিপোর্ট দিয়েছে, গত ১৬ বছরে দেশ থেকে প্রায় সোয়া ২ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে। এ টাকা এ দেশের মানুষের টাকা, এ টাকায় দেশের উন্নয়ন হতে পারতো। তাই লুটেরাদের লুটপাট বন্ধ করতে “হ্যাঁ”তে ভোট দিতে হবে।’
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক মাকসুদ হেলালী, খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল হক প্রমুখ। মতবিনিময় সভায় খুলনা বিভাগের ১০ জেলার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।