image

অচল গোদাগাড়ী-সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর

জেলা বার্তা পরিবেশক, রাজশাহী

উদ্বোধনের দুই বছরের মাথায় কার্যত অচল হয়ে পড়েছে রাজশাহীর বহুল প্রত্যাশিত গোদাগাড়ী-সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর। সীমান্ত বাণিজ্য সম্প্রসারণ, পরিবহন ব্যয় কমানো ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে গতি আনার লক্ষ্য নিয়ে ২০২৪ সালে পরীক্ষামূলকভাবে যাত্রা শুরু করা এই নৌবন্দরটি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, সংযোগ সড়ক ও নাব্যতা নিশ্চিত না করেই উদ্বোধন করা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে কয়েক মাসের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায় পণ্য পরিবহন কার্যক্রম।

রাজশাহী অঞ্চলের মানুষের বহু কাঙ্খিত ও সম্ভবনাময় নৌবন্দর (গোদাগাড়ী-সুলতানগঞ্জ) উদ্বোধনের পর থেকেই প্রায় অচল হয়ে পড়ে আছে। এতে এই অঞ্চলের মানুষের মাঝে চরম হতাশা বিরাজ করছে।

জানা গেছে, রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার সুলতানগঞ্জ ও ভারতের মুর্শিদাবাদের ময়া নৌবন্দর দীর্ঘ ৫৯ বছর পর ২০২৪ সালে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়। কিন্তু বছর না ঘুরতেই কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। একাধিকবার বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর আশ্বাস মিললেও এখনও পুরোপুরি চালু হয়নি এই সম্ভাবনাময় নৌবন্দর। ফলে স্বল্প খরচে পণ্য আমদানি ও পরিবহনের যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তা এখনও বাস্তবায়ন হয়নি।

স্থানীয়রা বলছে, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রস্তুত না করেই ২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি গোদাগাড়ী-সুলতানগঞ্জ নৌবন্দরের উদ্বোধন করা হয়। পরীক্ষামূলকভাবে ভারতের মুর্শিদাবাদের ময়া রুট দিয়ে কয়েক মাস পণ্য আমদানি হলেও অবকাঠামোগত ঘাটতির কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে বন্দরটি দীর্ঘদিন ধরে কার্যত বন্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বছর নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনের পর বন্দরটি চালুর উদ্যোগ নেয়া হলেও সংযোগ সড়কসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ কাজ এখনও ধীরগতিতে এগোচ্ছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, বন্দরের অফিস কক্ষ ও সীমানা প্রাচীর নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকলেও পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালুর জন্য আরও প্রস্তুতির প্রয়োজন রয়েছে। রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক নজরুল ইসলাম হেলাল বলেন, সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর চালু হলে ভারতের মুর্শিদাবাদের ময়া ঘাট হয়ে পণ্য আমদানি ও পরিবহন ব্যয় অন্তত ৩০ শতাংশ কমবে। এতে রাজশাহীর ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন গতি আসবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড রাজশাহী বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী জানান, বর্তমানে নৌপথে পানি থাকলেও বড় পরিসরে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলের জন্য ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রয়োজন। মৌসুমি পরিবর্তনের কারণে পদ্মা নদীর নাব্যতা কমে গেলে বড় জাহাজ চলাচলে সমস্যা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ড্রেজিং ছাড়া এই নৌপথকে পুরোপুরি কার্যকর রাখা কঠিন হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এদিকে সুলতানগঞ্জ থেকে ভারতের মুর্শিদাবাদের ময়া বন্দরের দূরত্ব মাত্র ২০ কিলোমিটার। এ বিষয়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) জানায়, পানির বর্তমান নাব্যতা অনুযায়ী এই নৌপথে নৌযান চলাচলে কোনো বড় প্রতিবন্ধকতা নেই। সুলতানগঞ্জ নদীবন্দরের সহকারী বন্দর ও পরিবহন কর্মকর্তা দিনেশ কুমার সাহা বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অনুমোদন পাওয়া গেলে দ্রুতই বন্দরটি চালু করা সম্ভব। তবে অন্যান্য চ্যানেলে নিয়মিত নৌযান চলাচলের জন্য ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রয়োজন হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৯৬৫ সালে সুলতানগঞ্জ-ময়া এবং গোদাগাড়ী-লালগোলা নৌঘাটের মধ্যে নিয়মিত বাণিজ্যিক কার্যক্রম চলত। যুদ্ধের পর এই রুট বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে রাজশাহী থেকে ভারতের ধূলিয়ান পর্যন্ত ৭৮ কিলোমিটার নৌপথ অনুমোদন পেলেও পদ্মার নাব্যতা সংকটের কারণে তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। পরে সংক্ষিপ্ত করে সুলতানগঞ্জ-ময়া রুট নির্ধারণ করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর পুরোপুরি চালু করতে হলে এনবিআরের অনুমোদনের পাশাপাশি সংযোগ সড়কসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো দ্রুত সম্পন্ন করা জরুরি। সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই সম্ভাবনাময় নৌবন্দরকে কার্যকর করে রাজশাহী অঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে।

সম্প্রতি