image

পীরগঞ্জে ভর্তুকির সার বেশি দামে বিক্রি

প্রতিনিধি, পীরগঞ্জ (রংপুর)

পীরগঞ্জে সরকারি ভর্তুকির আমদানি করা রাসায়নিক সার অতিরিক্ত মূল্যে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা। ডিলারের দোকানে সার কিনতে গেলেই কৃষকদের ভাইভা (মৌখিক পরীক্ষা) নেন ডিলাররা। এতে ডিলার সন্তুষ্ট হলেই কৃষকরা অতিরিক্ত মূল্যে সার কিনতে পারেন। এভাবেই প্রতি মাসে ৩০ থেকে ৩৫ লক্ষ টাকা কৃষকের পকেট থেকে লুটে নিচ্ছে বিসিআইসির সার ডিলাররা। এমন অসংখ্য অভিযোগ থাকলেও উপজেলা কৃষি বিভাগ বিষয়টা আমলে নিচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নে ১৫ জন বিসিআইসির সার ডিলার রয়েছেন। আবার তাদের অনেকেই বিএডিসির (১৮ জন) ডিলার। ফলে দুটো ডিলারের রাসায়নিক সার একসঙ্গে তারা উত্তোলন করে স্থানীয় খুচরা বিক্রেতা এবং বাহিরের উপজেলায় বিক্রি করছে। ভর্তুকির আমদানিকৃত ডিএপি (ডাই অ্যামোনিয়াম ফসফেট) প্রতি বস্তা সার এক হাজার ৫০ টাকায় বিক্রি করার নির্দেশনা থাকলেও ডিলাররা কৃষক এবং খুচরা বিক্রেতার কাছে প্রতি বস্তা সার ১২শ থেকে সাড়ে ১২শ টাকা বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সেইসঙ্গে খুচরা বিক্রেতারাও বস্তা প্রতি ১৪শ থেকে ১৫শ টাকায় কৃষকদের কাছে বিক্রি করছেন। যে কারণে কৃষকরা প্রতি বস্তা আমদানিকৃত ভর্তুকির সার দেড়শ থেকে সাড়ে ৪শ টাকা পর্যন্ত বেশি দিয়ে কিনতে হচ্ছে বলে ভুক্তভোগী কৃষকরা অভিযোগ করেন। চলতি জানুয়ারি মাসে উপজেলায় প্রায় সাড়ে ৩শ মে. টন ভর্তুকি মূল্যে আমদানিকৃত ডিএপি সার বরাদ্দ এসেছে। ওই সারগুলো ডিলাররা অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রি করায় কৃষকদের পকেট থেকে ৩০ থেকে ৩৫ লক্ষ টাকা লুটে নিচ্ছে। উপজেলার ডিলাররা কৃষকদের পরিবর্তে খুচরা সার ব্যবসায়ীদের কাছে সার বিক্রিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।

কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ১৫ জন বিসিআইসি ডিলারের মাঝে গত নভেম্বর/২৫ এ প্রায় ৫শ মে. টন ডিসেম্বর/২৫ এ ৫২৫ মে. টন এবং জানুয়ারি/২৬ এ প্রায় সাড়ে ৪শ মে টন আমদানিকৃত ডিএপি সার বরাদ্দ দেয়া হয়। ওই বরাদ্দকৃত সারে প্রতি বস্তায় সরকার ১শ টাকা করে ভর্তুকিও দেয়। তারপরও ডিলাররা প্রতি বস্তায় দেড়শ থেকে ২শ টাকা করে অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রি করছে। এতে প্রতি মাসেই ৩০ থেকে ৩৫ লক্ষ টাকা কৃষকের কাছ থেকে ডিলার এবং খুচরা সার বিক্রেতারা লুটে নিচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার বড় আলমপুর ইউনিয়নের বিসিআইসির ডিলার ‘মেসার্স তৃপ্তি ট্রেডার্স’ এর প্রোপ্রাইটর তোজাম্মেল হক দুদুর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত মূল্যে সার বিক্রি এবং পাচারের অভিযোগ করলেও কৃষি বিভাগ তা আমলে নিচ্ছেন না। ওই ডিলার সার উত্তোলনের পর প্রতিদিনই অসংখ্য ভ্যানযোগে সারগুলো দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ, ঘোড়াঘাট উপজেলায় পাচার করছেন। এছাড়াও তার সারগুলো বড় আলমপুর ইউনিয়ন থেকে টুকুরিয়া ইউনিয়নের টুকুরিয়া হাটের মেসার্স রাহেনা ট্রেডার্স (প্রো. আব্দুর রাজ্জাক মিয়া) এবং চতরা ইউনিয়নের চতরাহাটের তাহের মিয়ার দোকান ‘মেসার্স ভাই ভাই ট্রেডার্সে’ পাঠানো হচ্ছে। ডিলার দুদু মিয়ার সার অসংখ্য বার পাচারের সময় এলাকাবাসী আটক করে মাঠপর্যায়ের কৃষি বিভাগের কর্তা ব্যক্তি এবং উপজেলা কৃষি অফিসারকে অভিযোগ দিলেও রহস্যজনকভাবে তা মীমাংসা হয়ে যায়। বড় আলমপুর ইউনিয়নের উজিরপুরের লুৎফর রহমান, পাটগ্রামের মন্টু মিয়া, কৈগাড়ী গ্রামের তালেব মিয়া, ফতেপুরের রাজা মিয়া, রাজারামপুরের তাহের মিয়া জানান, হামরা দুদু ডিলারের কাছে সার নিবার গেলে ম্যালা প্রশ্ন করে। সার দিব্যার চায় না। হামরা আবাদ নিয়া শংকিত থাকি। হাট-বাজার থেকে অতিরিক্ত ট্যাকায় সার কিনি আবাদ করায় খরচও বেশি হয়। ইউনিয়নটির উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোস্তাফিজার রহমান অভিযোগগুলো সম্পর্কে অবগত থাকলেও তিনি চুপচাপ থাকেন বলে জানা গেছে। ডিলার দুুদ জানান, আমি প্রকৃত কৃষকদের কাছে সার বিক্রি করি। সেইসাথে কিছু সার খুচরা বিক্রেতার কাছেও বিক্রি করি। তবে অতিরিক্ত দাম নেই না। ভেন্ডাবাড়ী ইউনিয়নের বিসিআইসির ডিলার মেসার্স সোনালী ভান্ডার-এর স্বত্বাধিকারী মোছা. মাহফুজা বেগম এবং তার ম্যানেজার রেজওয়ান হোসেনের বিরুদ্ধেও ভর্তুকি মূল্যের ডিএপি সার অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন ভেন্ডাবাড়ী রুপালী ব্যাংকের পুর্বপাশের এক খুচরা সার ব্যবসায়ী নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, ডিলাররাই অতিরিক্ত মূল্যে সার বিক্রি করায় কৃষকপর্যায়ে বেশি মূল্যে বিক্রি করছি। মেসার্স সোনালি ভান্ডারে সার কিনতে আসা এক মাদ্রাসার শিক্ষা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, নির্ধারিত দাম নয় ডিএপি সার ১২শ টাকায় কিনলাম। তাছাড়া সার দেয় না। সোনালী ভান্ডারের ম্যানেজার রেজওয়ান জানান, আমরা নির্ধারিত মূল্যে কৃষকদেরকে সার দিচ্ছি। তবে তিনি খুচরা বিক্রেতার কাছে সার বিক্রির ব্যাপারে কোন মন্তব্য করেননি।

উপজেলা কৃষি অফিসার সুমন মিয়া বলেন, অভিযোগগুলো বরাবরই শুনছি। পাশাপাশি কয়েকজন ডিলারকে জরিমানাও করা হয়েছে। এখন যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাচ্ছি, তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। ইউনিয়ন পর্য়ায়ে আরও ডিলার নিয়োগ দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এটি বাস্তবায়ন হলে সমস্য থাকবে না।

উল্লেখ্য, বিএডিসির ডিলাররা আমদানিকৃত ডিএপি, টিএসপি এবং ইউরিয়া সার বরাদ্দ পান না। যদি তাদেরকেও আমদানিকৃত সার বরাদ্দ দেয়া এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে আরও সার ডিলার নিয়োগ দেয়া হয় তাহলে কৃষকরা সারের ব্যাপারে নির্বিঘেœ থাকতে পারতেন।

‘সারাদেশ’ : আরও খবর

সম্প্রতি