যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক আছেন বাগেরহাট সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দাম। তার স্ত্রী, কানিজ সুবর্না, ও ৯ মাস বয়সী শিশুসন্তান, শেজাদ হাসানের, মরদেহ শুক্রবার উদ্ধার করে পুলিশ।
তাদের জানাজায় অংশগ্রহণের জন্য জুয়েলের প্যারোলে মুক্তি মেলেনি। একে সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।
এক বিবৃতিতে সংগঠনটি জানিয়েছে, মৃত স্ত্রী ও শিশুসন্তানের মুখমণ্ডল কারাফটকের ভেতরে দেখানো হলেও তাদের জানাজা ও দাফনে অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বন্দীকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
কানিজ সুবর্ণার বাবা রুহুল আমিন হাওলাদার সদর মডেল থানায় হত্যা মামলা করেছেন বলে জানিয়েছেন বাগেরহাট সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাসুম খান। তিনি বলেন, মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মামলার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ দুটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, কানিজ সুবর্ণা ও জুয়েল হাসান সাদ্দাম কয়েক বছর আগে বিয়ে করেন। সন্তানের জন্মের আগে থেকেই জুয়েল বিভিন্ন মামলায় কারাবন্দী রয়েছেন।
নিহত সুবর্ণার ভাই মো. শুভ জানান, দীর্ঘদিন ধরে স্বামী কারাবন্দী থাকায় অনেকটাই হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন তাঁর বোন। তিনি মানসিকভাবে অনেকটাই ভেঙে পড়েছিলেন। তবে অন্য কিছুও থাকতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি প্রশাসনের কাছে ঘটনা তদন্তের দাবি জানান।
মো. শুভ আরও বলেন, ‘ছেলেটাকে আমার দুলাভাই একবারও কোলে নিতে পারেনি। শেষবারের জন্য যেন একটু দেখতে পারে, তাই নিয়ে গিয়েছিলাম।’
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে আত্মগোপনে ছিলেন জুয়েল হাসান সাদ্দাম। গত বছরের ৫ এপ্রিল গোপালগঞ্জ থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তারপর থেকে বিভিন্ন মামলায় কারাগারে আটক রয়েছেন তিনি।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং সমান আইনি সুরক্ষার অধিকারী। সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ নাগরিককে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার প্রদান করে। ৩৫(৫) অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর দণ্ড বা আচরণের শিকার করা যাবে না। একজন বিচারাধীন বন্দী হিসেবে জুয়েল হাসান সাদ্দাম এসব সাংবিধানিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত নন। অথচ তাঁর স্ত্রী ও শিশুসন্তানের মৃত্যুজনিত চরম মানবিক পরিস্থিতিতে পরিবারের আবেদন থাকা সত্ত্বেও প্যারোলে মুক্তি না দেওয়া এবং জানাজা ও দাফনে অংশগ্রহণের সুযোগ অস্বীকার করা কার্যত তাঁকে অমানবিক ও অবমাননাকর আচরণের শিকার করেছে। এটি সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদের সরাসরি ব্যত্যয়।’
প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে সরকারি নীতিমালার কথা উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০১৬ সালের ১ জুন একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে। ওই নীতিমালায় বলা হয়েছে, ভিআইপি বা অন্য সব শ্রেণির কয়েদি বা হাজতি বন্দীদের নিকটাত্মীয়ের যেমন বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি, স্বামী-স্ত্রী, সন্তানসন্ততি এবং আপন ভাই-বোন মারা গেলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া যাবে। এই নীতিমালা প্রশাসনিক বিবেচনার বিষয় হলেও তা ইচ্ছেমতো, নির্বিচারে বা কোনো যুক্তি প্রকাশ না করে প্রত্যাখ্যানযোগ্য নয়। এ ক্ষেত্রে পরিবার থেকে আবেদন জানানো সত্ত্বেও এ বিধান প্রয়োগ না করা আইনের উদ্দেশ্য ও ন্যায্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার পরিপন্থী বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।’
আন্তর্জাতিক আইনের উদাহরণ টেনে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘আন্তর্জাতিক আইনেও প্যারোলের বিষয়ে অধিকার সুরক্ষিত। আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদের (আইসিসিপিআর) অনুচ্ছেদ ৭–এ নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অনুচ্ছেদ ১০(১) এ বলা হয়েছে, স্বাধীনতাবঞ্চিত সকল ব্যক্তির সঙ্গে মানবিকতা ও মর্যাদার সঙ্গে আচরণ করতে হবে। কারাফটকে পাঁচ মিনিটের জন্য মৃত স্ত্রী ও শিশুসন্তানের মুখ দেখিয়ে একজন শোকাহত বন্দীকে জানাজা ও দাফনে অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত করা, আইসিসিপিআরের উল্লিখিত ধারাসমূহের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ।’
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘কোন আইন, বিধি বা নির্বাহী আদেশের ভিত্তিতে পরিবারের আবেদন থাকা সত্ত্বেও প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়নি, তা জানার অধিকার দেশের নাগরিকদের রয়েছে। আইনের শাসন কেবল সিদ্ধান্ত গ্রহণেই সীমাবদ্ধ নয়, সিদ্ধান্তের কারণ প্রকাশ এবং সেই সিদ্ধান্তের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ ক্ষেত্রে কারা কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নীরবতা, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচার ও বৈষম্যমূলক আচরণের গুরুতর প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে।’
আসকের বিবৃতিতে বলা হয়, এই ঘটনায় যে দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে, তা একটি সংবিধানস্বীকৃত, গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারসম্মত রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ বিষয়ে রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও জবাবদিহি অপরিহার্য। পাশাপাশি উচ্চ আদালতের স্বপ্রণোদিত পদক্ষেপ গ্রহণেরও সুযোগ রয়েছে।