image
শরীয়তপুর : আঞ্চলিক সড়কের বেহাল দশা -সংবাদ

শরীয়তপুর-চাঁদপুর আঞ্চলিক সড়ক প্রকল্পে অনিশ্চয়তা

প্রতিনিধি, শরীয়তপুর

শরীয়তপুর-চাঁদপুর আঞ্চলিক সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে ভয়াবহ অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত ৯৫ দশমিক ৮৫ হেক্টর জমির মধ্যে মাত্র ৪৯ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করতেই ব্যয় হয়ে গেছে প্রায় পুরো বরাদ্দকৃত ৪৩১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। ফলে বাকি ৪৬ দশমিক ৮৫ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে সড়ক নির্মাণ কাজে। অর্থসংকটে পুরো প্রকল্প কার্যত থমকে আছে।

২০১৯-২০ অর্থবছরে অনুমোদিত ৮৬০ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পের আওতায় মনোহর বাজার থেকে ভেদরগঞ্জ উপজেলার ইব্রাহীমপুর পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার সড়ককে চার লেনে উন্নীত করার কথা ছিল। তবে ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ৬ কিলোমিটার সড়কের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ২৯ কিলোমিটার সড়ক এখনও বেহাল অবস্থায় পড়ে আছে, যা যান চলাচলের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।

সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালে জেলা প্রশাসনের তৈরি প্রাক্কলনে পুরো ৯৫ দশমিক ৮৫ হেক্টর জমি অধিগ্রহণে ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৪৩২ কোটি টাকা। সেই হিসাব অনুযায়ী সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় জেলা প্রশাসকের অনুকূলে ৪৩১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, মাত্র অর্ধেকের কিছু বেশি জমি অধিগ্রহণেই পুরো অর্থ ব্যয় হয়ে গেছে। প্রকল্প এলাকায় বসবাসকারী শত শত পরিবার ছয় বছর ধরে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। শরীয়তপুর-চাঁদপুর সড়কের পাপরাইল এলাকার বাসিন্দা ইব্রাহীম সরদার জানান, তার ছোট চায়ের দোকান ও টিনশেড ঘর বর্ষা মৌসুমে পানিতে ডুবে যায়। অথচ জমি অধিগ্রহণের আওতায় পড়ায় ঘর সংস্কার কিংবা উন্নয়ন করতেও প্রশাসনিক বাধা রয়েছে।

তিনি বলেন, ক্ষতিপূরণের টাকা পাইনি, আবার ঘর মেরামতও করতে পারছি না। দিন যত যাচ্ছে, জমির দাম তত বাড়ছে। নতুন জায়গায় গিয়ে থাকার সামর্থ্যও নেই।

বেনাপোল থেকে বিএসআরএমের লোহার কুচি নিয়ে চট্টগ্রাম যাচ্ছেন ট্রাক চালক আবু সুফিয়ান। শরীয়তপুরের বালারবাজার এলাকায় কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি জানান, এই মালামাল নিয়ে যেতে যেখানে এক ঘণ্টা লাগার কথা সেখানে তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা লাগছে। মালামাল ঠিকমতো পৌঁছাতে পারছি না। দেরি হয়ে গেলে শিপমেন্ট বাতিল হয়ে যায়। শুধু তাই নয় গাড়ির নাজেহাল অবস্থা হ্যাঙ্গার ভেঙে যায়, চাকা ফেটে যায়। শরীয়তপুর অংশে আসলেই নানা দুর্ভোগ। এ রাস্তার জন্য আমাদের অনেক কষ্ট হচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই সড়কটি চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মাধ্যম। সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে বন্দরে পণ্য পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে, বাতিল হচ্ছে শিপমেন্ট, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ব্যবসা ও জাতীয় অর্থনীতিতে।

সড়কের আওতায় থাকা আটটি এলএ কেসের অধীনে বাকি ৪৬ দশমিক ৮৫ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ কেন বন্ধ রয়েছে- এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের বক্তব্য জানতে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রথমে পরে জানাবেন বলে আশ্বাস দিলেও আর কোনো সাড়া দেননি তিনি।

জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখা সূত্রে জানা যায়, ১৯টি এলএ কেসের মাধ্যমে জমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম শুরু হলেও গত পাঁচ বছরে মাত্র ১১টি এলএ কেসের কাজ শেষ হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে ৪৩০ কোটি ২৯ লাখ টাকা। বর্তমানে অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র ১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, যা দিয়ে বাকি জমি অধিগ্রহণ সম্ভব নয়। অবশিষ্ট জমি অধিগ্রহণে নতুন করে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা প্রয়োজন, যা এই মুহূর্তে প্রকল্প ব্যয়ে অন্তর্ভুক্ত নয়।

ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ বরাদ্দ ৪৩১ কোটি টাকা শেষ হয়ে যাওয়ায় ৪২৯ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকা সড়ক নির্মাণকাজও থমকে গেছে। কবে নতুন করে অর্থ বরাদ্দ হবে, কবে শেষ হবে জমি অধিগ্রহণ, আর কবে শুরু হবে পূর্ণাঙ্গ নির্মাণ কাজ- এই প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই।

ফলে শরীয়তপুর-চাঁদপুর আঞ্চলিক সড়ক প্রকল্পটি এখন কেবল একটি উন্নয়ন পরিকল্পনা নয়, বরং হাজারো মানুষের দুর্ভোগ আর অনিশ্চয়তার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম বলেন, বিষয়টি একটি বিভাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না আরও কয়েকটি পক্ষ আছে। প্রাক্কলন সঠিক হয়েছিল কিনা, প্রাক্কলনের সব টাকা বুঝিয়ে পেয়েছিল কিনা, বিষয়টি নিয়ে বিভাগীয় পর্যায়েও আলাপ হয়েছে। আমাকে আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে দেখেতে হবে। অসংগতি পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

‘সারাদেশ’ : আরও খবর

সম্প্রতি