image

বরেন্দ্রের ভূগর্ভস্থ নামছে পানি, মানুষ হারাচ্ছে ভরসা

জেলা বার্তা পরিবেশক, রাজশাহী

বরেন্দ্রের মাটি চিরকালই খরার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকার পাঠ শিখিয়েছে। সূর্যের তাপে ফেটে যাওয়া জমিনের নিচে লুকিয়ে থাকা জলধারাই ছিল কৃষকের শেষ ভরসার জীবন, জীবিকা আর খাদ্যনিরাপত্তার নীরব সহচর। কিন্তু সেই ভূগর্ভস্থ জল যখন ক্রমে নেমে যাচ্ছে অদৃশ্য অতলে, তখন সংকট আর শুধু প্রকৃতির থাকে না; তা মানুষের ঘরে ঢুকে পড়ে, থালা-বাসনে, মাঠের আলপথে, শ্রমিকের কাঁধে। সেচ-নিষেধাজ্ঞা সেই সংকটকে যেন একদিনে বদলে গেছে চাষের ভাষা, কাজের ছন্দ, জীবনের হিসাব।

বরেন্দ্রের তিন জেলার ‘অতি উচ্চ পানি-সংকটাপন্ন’ এলাকার সেচ নিষেধাজ্ঞা-পরবর্তী আর্থসামাজিক পরিস্থিতি নিরূপণের দাবি উঠেছে। পর্যবেক্ষণ দলের তথ্য থেকে জানা গেছে, পানি-সংকটাপন্ন এলাকায় সেচ নিষেধাজ্ঞার ফলে বহুমাত্রিক সমস্যা দেখা দিয়েছে এবং আগামীতে নতুন নতুন সমস্যা দেখা দিতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যেই এলাকার খেত মজুররা কর্মহীন হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে এলাকার দরিদ্র মানুষের মধ্যে নিষেধাজ্ঞাজনিত উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাও দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষেরা বলেছেন, সেচ নিষেধাজ্ঞা খুবই আকস্মিক হয়েছে এবং বিকল্পগুলো নিয়ে বিবেচনার সুযোগ ছিল। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞার জীবন-জীবিকার ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়বে তা যাচাই করে দেখা হয় নি। ফলে ইতোমধ্যেই ওই নিষেধাজ্ঞা এলাকার সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

এই জানুয়ারির পাঁচ তারিখে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) রাজশাহী জেলা শাখা এবং রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের আট সদস্যের একটি দল রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর তিনটি উপজেলার পানি সংকটাপূর্ণ এলাকা পরিদর্শন করে তাদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। এই দল নিষেধাজ্ঞার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিষেধাজ্ঞা-পরবর্তী প্রভাব বিশ্লেষণ করেছেন।

বরেন্দ্র অঞ্চলে নানাবিধ প্রয়োজনে ক্রমবর্ধমান ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিনির্ভরতার ফলস্বরূপ পানিস্তর আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পানির নাগালও মিলছে না। এই পরিস্থিতিতে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর ২৫টি উপজেলার ৪৭টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৫০৩টি মৌজাকে ‘অতি উচ্চ পানি-সংকটাপন্ন’ এলাকা হিসেবে সরকার চিহ্নিত করেছে। এসব এলাকার ৮৭ লাখের বেশি মানুষ সরাসরি পানি-সংকটের সম্মুখীন হয়েছেন। অতিউচ্চ পানি সংকটাপূর্ণ এলাকাগুলোতে সেচে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ২০২৪-এর ৬ নভেম্বর গেজেট প্রকাশ করেছে সরকার।

অনিল সরেন বলেন, সেচ সুবিধার অভাব বা নিষেধাজ্ঞার কারণে বোরো আবাদ বন্ধ হওয়ায় স্থানীয় খেতমজুরেরা বেকার হয়েছেন। তারা অন্যের বোরো জমিতে কাজ করতেন। শ্রমিকরা ধান কেটে পারিশ্রমিক হিসেবে ধান পেতেন। এই ধান তাদের বছরের খাদ্য নিরাপত্তায় সহায়ক হতো। এক মণ ধান কাটলে ৮ কেজি ধান মজুরি পেতেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউনিয়নের ৪-৫ হাজার খেতমজুর কর্ম নিয়ে সমস্যার মধ্যে পড়েছেন। তারা অনেকেই সুযোগ পেলে অন্য জেলা বা উপজেলায় গিয়ে খেত মজুরের কাজ করছেন। অনিলের মতে নিষেধাজ্ঞা জারি হলেও খেতমজুরদের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। এর একটি সুরাহা না হলে ভবিষ্যতে সমস্যা আরও বাড়বে।

এলাকার নরেন চঁড়ের ছেলে সুমায়েন চঁড়ে (৩৮) এখন বেকার হয়ে পড়েছেন। মজুরি বাবদ পাওয়া ধান দিয়ে আরও মাস দুয়েক চলে যাবে। কিন্তু শুধু তো চাল সেদ্ধ করেই চলে না তার সঙ্গে শাক-সবজি বা তরকারির প্রয়োজন হয়। কিন্তু তা কেনার সামর্থ তার নেই। তার মতে এমন একটা ব্যবস্থা বাঞ্ছনীয়- যাতে করে এলাকার মজুর শ্রেণির কর্মসংস্থানের একটি বিহিত হয়। তবে তিনি বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির যেমন সুরক্ষা দিতে হবেÑ তেমনই তাদের ফসল উৎপাাদনের জন্য সেচ সুবিধার বিকল্প সরকারকেই করতে হবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার সাংবাদিক আব্দুস সাত্তার পর্যবেক্ষক দলকে বলেন, বরেন্দ্র এলাকার খরা মোকাবিলায় বেশ কিছু উদ্যোগের কথা শোনা যায় কিন্তু তার বাস্তবায়ন লক্ষ্য করা যায় না। যেমনÑ ভবন কোড অনুযায়ী বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের কথা বলা হয়, কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে এর প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায় না। কৃত্রিম উপায়ে বৃষ্টির পানি ভূগর্ভ স্তরে নিয়ে রিচার্জ করার উদ্যোগও তেমন এগোয়নি। তিনি বোরো মৌসুমে পদ্মার পানির ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, এক সময় উপজেলার নেজামপুরে ভূস্তরের ৪৫ ফিটের মধ্যেই পানি পাওয়া যেত, এখন ১৫০ ফিটেও পানি পাওয়া যায় না। এই পরিস্থিতি ভয়াবহ দুর্যোগের ইঙ্গিত দেয়।

নাচোল উপজেলার কশবা ইউনিয়নের ছুটিপুর আদিবাসীপাড়াতে পানি নিয়ে একই ধরনের সমস্যা পরিলক্ষিত হয়। তবে, বিএমডিএ পানীয়জল সরবরাহ করে, জনপ্রতি কুড়ি টাকা (হেরফের হয়) পানিচার্জ নিয়ে থাকেন। এইগ্রামেও জলভরা পুকুর রয়েছে। তবে মাছ চাষের জন্য লিজ দেয়া হয়, এ পানি সাধারণের ব্যবহার অনুপযোগী।

নওগাঁ জেলার সাপাহার সদর থেকে ৬ কি.মি পশ্চিমে বাখরপুর তালতলা গ্রামের স্বপন হেমব্রমের স্ত্রী পোস্তান সরেন বলছিলেন, তাদেরকে প্রতিমাসে জনপ্রতি ২০ টাকা করে পানির জন্য দিতে হয়। সদ্যজাত শিশুর জন্যও এই চার্জ প্রয়োজ্য। এখানে গরু প্রতিও ২০ টাকা দিতে হয়।

পোস্তান সরেনের বর্ণনায় এটা স্পষ্ট যে, খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ- ব্যবসা বিবেচনায় দেখা হয়।

পর্যবেক্ষণ দলের মতে, অচিরেই বিকল্প ব্যবস্থা না হলে- পারিবারিক কৃষি ঝুঁকির মুখে পড়বে, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্যে অভিগম্যতা কমবে; পানি আইন, বর্গা আইন কিংবা মহামান্য হাইকোর্টের রায় লঙ্ঘিত হতে পারে। সাধারণ মানুষের সমস্যা সমাধানের উপায়গুলোও ছিল বেশ সুচিন্তিত ও গঠনমূলক। এলাকার মানুষ পানির সংকটকে নিজেদের সমস্যা বোধ করছেন, একইভাবে তারা তাদের জীবন-জীবিকা অনিশ্চয়তায় উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।

তাদের পরামর্শ হলো- বোরো আবাদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিন মাস খেত মজুরদের জন্য সরকারি প্রণোদনা প্রয়োজন। এবং ভূ-উপরিস্থ জলাধার- পুকুর, খাড়ি, বিল-নদী উদ্ধার ও খনন করা এবং সামাজিক মালিকানায় নেয়া; সেচ কাজে পদ্মা ও মহানন্দার পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, বিএমডিএর কর্মপরিধি পর্যালোচনা পূর্বক তা পুনঃনির্ধারণ করা আবশ্যক এবং সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের কৃষি ও সেচ বিষয়ক কর্মকান্ডে জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করে জনবান্ধব কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা।

বরেন্দ্র অঞ্চলের পানির স্তর সংকট কেবল একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়। এটি সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিকÑ সর্বোপরি মানবিক সমস্যা। সেই নিরিখেই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সমাধান দিতে হবে।

‘সারাদেশ’ : আরও খবর

সম্প্রতি