দেশ-বিদেশের পর্যটকদের পদচারণায় মৌলভীবাজার জেলা প্রায় সারা বছরই মুখর। বিশেষ করে শ্রীমঙ্গল- প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, চা-বাগান ও জীববৈচিত্র্যের জন্য পরিচিত এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র। এখানকার পাহাড়ি পথে চলাচলের প্রচলিত ও জনপ্রিয় বাহন ‘চান্দের গাড়ি’ বহু পর্যটকের কাছে রোমাঞ্চের নাম হলেও, সেই রোমাঞ্চই ক্রমশ বন্যপ্রাণীর জন্য পরিণত হচ্ছে ভয়ংকর মৃত্যুফাঁদে।
গত ১৬ জানুয়ারি চান্দের গাড়িতে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা যেমন রোমাঞ্চকর ছিল, তেমনই উদ্বেগজনকও। শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এলাকায় নির্ধারিত গতিসীমা ও বন্যপ্রাণী সুরক্ষা বিষয়ে চালকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতায় সেই প্রশিক্ষণের কোনো কার্যকর প্রতিফলন মাঠপর্যায়ে দেখা যাচ্ছে না। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে যাওয়া শ্রীমঙ্গলকমলগঞ্জ সড়কে ধীরগতিতে গাড়ি চালানোর অনুরোধ জানালে অনেক চালকের একই যুক্তি- গতি কমালে পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি উঠবে না। এই যুক্তির আড়ালেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে এক নির্মম বাস্তবতা- বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের নির্দেশনা ও প্রশিক্ষণ যেন কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ। পর্যটক বহনেকে কত দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে- এই অসুস্থ প্রতিযোগিতাই এখানে অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।
এই অবহেলার মর্মান্তিক পরিণতি আবারও সামনে আসে গতকাল রোববার। মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে যাওয়া সড়কে দ্রুতগতির একটি গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ হারায় একটি শিশু বানর। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে একদল বানর রাস্তা পার হওয়ার সময় দ্রুতগতির গাড়িটি শিশুটিকে চাপা দিয়ে চলে যায়। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। ঘটনার পর হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। শিশু বানরটির মৃত্যুর পর মা বানরটি গাছের এক ডাল থেকে অন্য ডালে লাফিয়ে লাফিয়ে কান্নাকাটি করতে থাকে। গভীর বনের নীরবতার মধ্যে সেই আর্তনাদ যেন মানুষের অবহেলা ও উদাসীনতার বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে যাওয়া এই সড়ক ও রেলপথ দীর্ঘদিন ধরেই বন্যপ্রাণীদের জন্য এক ভয়ংকর মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। বন বিভাগের নিষেধাজ্ঞা ও স্থাপিত গতিরোধক থাকা সত্ত্বেও চালকরা নিয়মিতভাবে নির্ধারিত ২০ কিলোমিটার গতিসীমা অমান্য করে গাড়ি চালাচ্ছেন। ফলে প্রায় সময়ই চশমা পরা হনুমান, বানর, অজগরসহ নানা প্রজাতির পশু ও পাখি সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে।
উল্লেখ্য যে, অতীতেও লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের বনের ভেতর দিয়ে শ্রীমঙ্গল থেকে ভানুগাছ গ্রামের দিকে যাওয়া সড়কে অসংখ্য পশু-পাখি গাড়ির নিচে চাপা পড়ে মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। শুধু সড়কপথই নয়, শ্রীমঙ্গল-ভানুগাছগামী রেলপথটিও গভীর বনের ভেতর দিয়ে যাওয়ায় ট্রেনের নিচে চাপা পড়ে বিভিন্ন ধরনের বন্যপ্রাণী নিহত হওয়ার ঘটনাও নিয়মিত ঘটছে। এসব ঘটনায় লাউয়াছড়ার জীববৈচিত্র্য দিন দিন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে। বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা বারবার চালকদের সচেতন করার চেষ্টা করছি। কিন্তু বনের ভেতরে গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ না করলে এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যু রোধ করা কঠিন। লাউয়াছড়া বিট কর্মকর্তা মারযোগ হোসেন জানান, দ্রুতগতির গাড়ির ধাক্কায় শিশু বানরটির মৃত্যু হয়েছে। দুর্ঘটনাকবলিত বানরটির মরদেহ উদ্ধার করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে যানবাহন চলাচল সীমিত করা অথবা বিকল্প সড়ক ও রেলপথ নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের মতে, যদি এই সড়ক ও রেলপথে কঠোরভাবে গতি নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত নজরদারি এবং বাস্তবসম্মত বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তবে অচিরেই লাউয়াছড়া তার অমূল্য জীববৈচিত্র্য হারাবে। চোর যেমন ধর্মকথা শোনে না, তেমনি কিছু চালকও বন্যপ্রাণী রক্ষার আহ্বান শোনে না- এটাই আজকের নির্মম বাস্তবতা।
প্রশ্ন থেকেই যায়- প্রশিক্ষণ ও নির্দেশনা কি সত্যিই মাঠপর্যায়ে কার্যকর, নাকি সেগুলো কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে?
লাউয়াছড়ার নীরব বন আজও সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে- প্রতিটি চাপা পড়া প্রাণের রক্তচিহ্ন বয়ে নিয়ে।
অর্থ-বাণিজ্য: বিশ্ববাজারে সোনার দামে রেকর্ড
অর্থ-বাণিজ্য: ব্যাংক থেকে কর্পোরেট ঋণ কমানো হবে: গভর্নর
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি: চতুর্থবারের মতো টিএমজিবি সদস্যদের সন্তানদের মাঝে শিক্ষাবৃত্তি ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি: বিকাশ অ্যাপ থেকেই সেবা সংক্রান্ত অভিযোগ ও এর অগ্রগতি ট্র্যাক করার সুযোগ