সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্য বৈষম্য এবং অবহেলার পরিসমাপ্তির জবনিকায় অবশেষে উত্তরবঙ্গের জন্য এক ঐতিহাসিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষে গত রোববার অষ্টম একনেক বৈঠকে সরকার। চীনের অনুদানে নীলফামারী জেলায় নির্মিত হচ্ছে এক হাজার শয্যার অত্যাধুনিক বিশেষায়িত হাসপাতাল। দেশের অন্তত ২০টি জেলার আবেদন, দাবি ও আন্দোলনের পর স্বাস্থ্যসেবার প্রকৃত চাহিদা, ভৌগোলিক বাস্তবতা ও সামাজিক ঝুঁকি বিবেচনায় নীলফামারীকেই চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করা হয়েছে। স্বাস্থ্য সচিব সাইদুর রহমান সংবাদকর্মীদের বলেন, নীলফামারীতে মানসম্মত কোনো বড় হাসপাতাল নেই। এখানকার মানুষকে চিকিৎসার জন্য ৫০ থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে হয়। এই বৈষম্য দূর করতেই চীনের অনুদানে হাসপাতালটি নীলফামারীতে হচ্ছে।
বাস্তবায়ন হবে ২০২৮ সালের মধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, অত্যাধুনিক ‘বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী জেনারেল হাসপাতাল’ প্রকল্পটি গত রোববার অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) ৮ম বৈঠকে অনুমোদিত হয়। এটি অনুমোদন হওয়ায় এখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২০২৮ সালের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ২৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে চীন সরকার দেবে ২ হাজার ২১৯ কোটি টাকা অনুদান, বাংলাদেশ সরকার দেবে বাকি ৭৩ কোটি টাকা। চীন সরকার হাসপাতালের অবকাঠামো নির্মাণ করবে। চিকিৎসক, নার্স ও জনবল নিয়োগ দিবে এবং হাসপাতাল পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে বাংলাদেশ সরকার।
জাতীয় গুরুত্বের হাসপাতাল কমপ্লেক্স পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন সভা (পিইসি) সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতাল কমপ্লেক্সে থাকবে ১০ তলা বিশিষ্ট মূল হাসপাতাল ভবন। অধ্যাপক ও জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকদের জন্য পৃথক ১০ তলা আবাসিক ভবন নার্সদের জন্য ৬ তলা ডরমিটরি, কর্মচারীদের জন্য ১০ তলা ভবন,বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্ভিস ভবন হেলিপ্যাড ও অটোমেটেড অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থাও থাকবে। হাসপাতালের যন্ত্রপাতি কেনায় ব্যয় হবে ৯৪৫ কোটি টাকা, ভবন নির্মাণে ৮০২ কোটি টাকা এবং সোলার প্যানেল, সিসিটিভি ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজে ২৪৮ কোটি টাকা।
দৈনিক ৬ থেকে ৯ হাজার মানুষ সেবা পাবেন। ইনডোরে ভর্তি রোগী হবে ৮০০ থেকে ১ হাজার। বহির্বিভাগে আসবেন ১,৮০০ থেকে ২,৩৫০ জন রোগী, এর জন্য প্রয়োজন হবে ১ থেকে দেড় হাজার চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারী।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমি (এনএপিডি) পরিচালিত সমীক্ষায় দেখা গেছে, নীলফামারীর জনসংখ্যা প্রায় ২১ লাখ, কিন্তু আছে মাত্র ২৫০ শয্যার হাসপাতাল। হৃদরোগ, কিডনি, ডায়াবেটিস, মাতৃ ও নবজাতক জটিলতা বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। এ ছাড়াও সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় শীতপ্রবাহ, বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি বেশি হওয়ায় এখানকার মানুষ অধিকাংশই দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী। এ এলকার উন্নত চিকিৎসা নিতে হলে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে ৫০-৭০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। এছাড়াও এখানে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, রেলওয়ে জংশন ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে। এ ছাড়া পর্যাপ্ত খাস জমি থাকায় ভূমি উন্নয়নের কোন প্রয়োজন নেই। নীলফামারী সদর উপজেলার দারোয়ানী এলাকায় সুতাকলের পরিত্যক্ত ২৫ একর খাস জমিতে হাসপাতালটি নির্মিত হবে। এলাকাটির পাশে রয়েছে বিজিবি ক্যাম্প ও উত্তরা ইপিজেড। ফলে স্থানীয় জনগণের পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলে কর্মরত দেশি-বিদেশি নাগরিকরাও এই হাসপাতালের সেবা পারবেন নিশ্চিন্তে।
দাবি-আন্দোলনের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে বাস্তবতার জয় হয়েছে। এর আগে ঠাকুরগাঁও, রংপুর ও পঞ্চগড়ে হাসপাতাল স্থাপনের দাবিতে মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালিত হয়। দীর্ঘ আলোচনা ও সমীক্ষার পর স্বাস্থ্যসেবার বাস্তব সংকট এবং জনস্বার্থ বিবেচনায় নীলফামারীকেই নির্মাণের স্থান চূড়ান্ত করা হয়।