নিরাপত্তা চেয়ে থানায় জিডি পরিবারের
রংপুরের তারাগঞ্জে মুচি সম্প্রদায়ের রূপলাল দাস ও প্রদীপ লাল দাসকে চোর অপবাদ দিয়ে মব ভায়োলেন্সের মাধ্যমে পিটিয়ে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনার অন্যতম মাস্টার মাইন্ড দুই আসামি মামলা তুলে নেয়ার জন্য প্রকাশ্যই মামলার বাদী ও নিহতদের স্বজনদের প্রাণনাশের হুমকি প্রদান করার অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় নিহত রুপলাল দাসের স্ত্রী ভারতী রানী তার ও পরিবারের নিরাপত্তা চেয়ে তারাগঞ্জ থানায় জিডি করেছেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তারাগঞ্জ থানার ওসি রুহুল আমিন।
নিহত রুপলাল দাসের স্ত্রী ও মামলার বাদী ভারতী রানী জানান, তার স্বামী ও ভাগ্নি জামাইকে মব করে হত্যা মামলার অন্যতম আসামি রুবেল পাইকার পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হবার পর সম্প্রতি জামিনে মুক্তি পেয়েছে অন্য আসামি সোহাগ প্রকাশ্য ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করছে না। এরা দুই আসামি মামলা থেকে তাদের নাম বাদ দেয়াসহ মামলা তুলে নেয়ার জন্য আমাকে ও আমার ছেলে রবিদাসকে প্রকাশ্যই হুমকি দিচ্ছে। তাদের কথা না শুনলে আমাদের হত্যা করারও হুমকি দেয়া হয়।
ভারতী রানী অভিযোগ করেন, গত ২২ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার তারাগঞ্জ বাজারে বাজার করতে গেলে আসামি রুবেল পাইকার ও সোহাগ আমাদের পথরোধ করে হত্যা মামলা থেকে তাদের নাম বাদ দেয়ার জন্য বলে। সেই সঙ্গে হত্যা মামলটিও তুলে নিতে হবে। অন্যথায় তাকে ও তার ছেলে রবি দাসকেও রব তৈরি করে হত্যা করা হবে বলে হুমকি দেয়। এ ঘটনার পর তারা পুরো পরিবার চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। ভয়ে তারা বাড়ি থেকে বের হতেও পারছেন না বলে জানান।
ভারতী রানী আরও বলেন, ন্যায়বিচারের আশায় মামলা করেছিলাম। কিন্তু এখন আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। আমাদের প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হচ্ছে। আমার ছেলে রবিদাস তারাগঞ্জ বাজারে মুচির কাজ করে সংসার চালায়। আসামিদের অব্যাহত হুমকির মুখে সেই বাজারে কাজ করতে ভয় পাচ্ছে।
তিনি বলেন, এখন তারা বিভিন্ন লোক মারফত আমাদের বলছে- মামলা থেকে তাদের নাম বাদ দেয়ার ব্যবস্থা না করা হলে পরিণতি খুবই ভয়াবহ হবে বলে জানানো হচ্ছে। এমনি অবস্থায় বাধ্য হয়ে গতকাল সোমবার তারাগঞ্জ থানায় আসামিদের নাম উল্লেখ করে জিডি করেছি।
এদিকে নিহত রূপলাল দাসের ছেলে জয় রবিদাস বলেন, আমার বাবাসহ দুইজনকে মব তৈরি করে পিটিয়ে হত্যা করার ঘটনায় ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে- আসামি রুবেল পাইকার ও সোহাগও অংশ নিয়েছে । তারা গণপিটুনিতেও অংশ নিয়েছে। অথচ সেই সোহাগ এখনও প্রকাশ্যই ঘুরে বেড়াচ্ছে। সে নিজে ও তার লোকজন দিয়ে মামলা তুলে নিতে হুমকি দিচ্ছে। কিন্তু পুলিশ তাকে ধরছে না। অন্যদিকে রুবেল পাইকার জামিনে এসে হুমকি দিচ্ছে। আমরা এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। তাহলে কি আমার বাবাসহ স্বজনকে হত্যার ব্যাপারে আইনের আশ্রয় নেয়া মামলা করা কি অন্যায় করলাম নাকি। তাহলে কি আমরা কি ন্যায় বিচার পাব না বলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে।
উল্লেখ্য, গত বছরের ৯ আগস্ট রাতে তারাগঞ্জ বাজার থেকে রূপলাল দাস ও তার ভাগ্নি জামাই প্রদীপ দাস রিকশাভ্যান নিয়ে তারাগঞ্জের ঘনিরামপুর গ্রামে রূপলালের বাড়িতে আসছিলেন। ওই দিন রাত সাড়ে ৮টার দিকে সয়ার ইউনিয়নের বুড়িরহাট বটতলা মোড়ে পৌঁছালে তাদের চোর সন্দেহে রিকশাভ্যান থামিয়ে পথরোধ করে মব তৈরি করে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে তাদের পার্শবর্তী স্কুলের মাঠে নিয়ে গিয়ে পিটিয়ে গুরতর আহত করে। প্রথমবার পুলিশ এসে তাদের উদ্ধার না করে চলে গেলেও দ্বিতীয়বার এসে দুজনকেই উদ্ধার করে তারাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসলে রুপলাল দাসকে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করে। গুরতর আহত প্রদীপ দাসকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলে সেখানে ভোরে প্রদীপ দাসও মারা যায়।
ওই ঘটনায় নিহত রুপলাল দাসের স্ত্রী ভারতী রানী বাদী হয়ে তারাগঞ্জ থানায় অজ্ঞাত ৫/৭শ’ জনের নামে হত্যা মামলা দায়ের করে। পুলিশ গত ৫ মাসে ১২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। মব তৈরি করে হত্যা করার নায়কদের এখনও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না বলে স্বজনদের অভিযোগ।
এ ব্যাপারে তারাগঞ্জ থানার ওসি রুহুল আমিনের সঙ্গে মঙ্গলবার, (২৭ জানুয়ারী ২০২৬) বিকেলে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জিডি করার বিষয়টি তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে নিশ্চিত করে জানান।