বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ৪১ একর ভূমি হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম মহানগরের ফৌজদারহাট স্টিল মিল রেললাইনের ওপর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের রাস্তা নির্মাণের কাজ চলমান থাকায় বিশাল এই ভূমি রেল কর্তৃপক্ষের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। এদিকে রাস্তার কাজ বন্ধ রাখতে রেললাইনের পার্শ্ববর্তী জায়গার ১০ জন মালিক বাংলাদেশ রেলওয়ে(পূর্বাঞ্চল) জেনারেল ম্যানেজার বরাবরে একটি লিখিত আবেদন করেছেন।
ওই আবেদনে জানা গেছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের এ লাইন চালুর জন্য ওইসব মালিকদের ভূমি হুকুম দখল করে। পরবর্তী পর্যায়ে রেললাইন নির্মিত হলে বেশ কয়েক বছর রেল চলাচল করে। হঠাৎ স্টিল মিল বন্ধ হলে লাইনটির ওপর দিয়ে রেল চলাচল না করায় বিভিন্ন পর্যায়ে রেললাইনের অংশ বিশেষ তুলে নেয়ায় রেললাইন বিলুপ্ত হয়ে যায়। তবে ফৌজদারহাট স্টিল মিল রেললাইনের জায়গাগুলো যাদের থেকে হুকুম দখল করেছে সরকার সংগত কারণে পার্শ্ববর্তী লাগোয়া জায়গা হওয়ায় উক্ত জায়গাগুলোতে এরা চাষাবাদ করে আসছে। বর্তমানে ওই রেললাইনের ওপর দিয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন রাস্তা নির্মাণ করে চলেছে। এ ব্যাপারে রেল কর্তৃপক্ষের আর.এম.ডি এর অনেক কর্মকর্তাকে মৌখিকভাবে জানালেও কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। এই রেললাইনের ওপর রাস্তা নির্মাণ করলে ৪১ একর ভূমি রেল কর্তৃপক্ষের হাতছাড়া হয়ে যাবে বলে আবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
জায়গার মালিকরা জানান, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে রাস্তা নির্মাণের অনুমতি দেয়া হলে রেললাইনের একপাশ দিয়ে রাস্তা নির্মাণের অনুমতি দেয়া হোক। কাজেই রেললাইনের এ রাস্তার ৪১ একর ভূমি রক্ষা করার স্বার্থে সিটি করপোরেশনকে অনুমতি না দেয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিনীত অনুরোধ করা হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মঙ্গলবার, (২৭ জানুয়ারী ২০২৬) রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) সুবক্তগীন বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, হালিশহর এলাকায় নির্মিত হচ্ছে রাস্তাটি। পরিত্যক্ত এই রেললাইনের ওপর সিটি করপোরেশন রাস্তা নির্মাণ করায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। কারও মতে স্থানীয়দের জমি একোয়ার করা হয়েছে রেললাইনের জন্য, রেললাইন হয়েছিল কিন্তু স্টিল মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই রেললাইনটির গুরুত্বও কমে যায়। আবার কারও মতে এই রেললাইন যেহেতু নেই এখানে রাস্তা নির্মিত হলে জনগণের যাতায়াতে সুবিধা অনেকটাই ভালো হবে। সরকার একসময় স্টিল মিল থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ করে। এই রেললাইন দিয়ে স্টিল মিলের উৎপাদিত পণ্য পরিবহন করতো। স্টিল মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এই রেললাইনটি কার্যত অচল হয়ে যায়। তবে ওই রেললাইনের পাশে রেল স্থাপনার কিছু নিদর্শন রয়ে গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্টিল মিল সাইডিং এ প্রকল্পে ৪১ একরের বেশি জায়গা রয়েছে। তবে ভূমি সংস্থাটির হাতে নেই। রেললাইন না থাকায় বেদখল হয়ে গেছে অধিকাংশ ভূমি। এরই মধ্যে এই রেললাইনের পাশের কিছু জায়গা লিজ দিয়েছিল রেলওয়ে ভূ-সম্পত্তি বিভাগ।
সূত্র জানায়, ২০২২ সালের ২০ অক্টোবর এই রেললাইনের একাংশের ১ একর ৮১ শতক জায়গা লিজ প্রদান করার সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। পরবর্তীতে লিজ গ্রহীতা দরপত্রের টাকা জমা দিতে না পারায় রেল কর্তৃপক্ষ কোনো সিদ্ধান্ত নিতে এখনও পারেনি। রেল কর্তৃপক্ষ পূর্বাঞ্চলের ভূমি অনেক স্থানে বেদখল রয়েছে এমন অভিযোগ নতুন কিছু না। আবার কখনো অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করার পর আবার বেদখলের ঘটনাটিও চলমান রয়েছে।
রেল সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করেন, রেল কর্তৃপক্ষ কোনো জায়গায় লিজ প্রদান করলে তা যেন লাইনের একপাশ থেকে দেয়া হয়। যদি লাইনের মাঝখানের জায়গা লিজ দেয়া হয় কিংবা কোনো সংস্থাকে দেয়া হয়, তাহলে পরবর্তীতে প্রয়োজন অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ পুনরায় রেললাইন স্থাপন করতে চাইলেও আর সুযোগ থাকবে না। কাজেই লিজ কিংবা কোনো সংস্থাকে রেললাইনের কোনো জায়গা প্রদান করা হয়, তাহলে ওই বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।
এদিকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বে-টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অদূর ভবিষ্যতে এই রেললাইনটি পুনরায় চালু করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিতে পারে, এমনটি আশঙ্কা করছেন রেল ও বন্দর সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে পূর্বাঞ্চল স্টিল মিল সাইডিং প্রকল্পের রেললাইনের ওপর এরই মধ্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের রাস্তার কাজ চলমান রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, হালিশহর কলসীর দীঘির পাড় থেকে আনন্দবাজার পর্যন্ত রাস্তার কাজ চলমান রয়েছে। অথচ রেল কর্তৃপক্ষ জানেই না তাদের পরিত্যক্ত রেললাইনের ওপর রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে। রেললাইনের ওপর রাস্তা নির্মাণের জন্য কোনো আন্তঃবিভাগীয় সভা বা সিদ্ধান্তক্রমে রেলভূমি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে হস্তান্তরের কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে তাদের মনে হয় না।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমান সোহেলের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।