image
শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) : ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান -সংবাদ

শ্রীমঙ্গলে থামছেই না অবৈধ বালু উত্তোলন ও পাচার

প্রতিনিধি, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার)

দেশের অন্যতম পর্যটন নগরী ও চায়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত শ্রীমঙ্গল উপজেলা আজ ক্রমেই পরিণত হচ্ছে অবৈধ সিলিকা বালু উত্তোলন ও পাচারের এক নীরব আতঙ্কের জনপদে। পাহাড়, বনাঞ্চল, চা-বাগান আর হাওরে ঘেরা এই পরিবেশসমৃদ্ধ এলাকায় প্রশাসনের একের পর এক অভিযানের পরও কোনোভাবেই থামছে না অবৈধ বালু উত্তোলনের তৎপরতা।

সম্প্রতি খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো (বিএমডি) কর্তৃপক্ষ শ্রীমঙ্গলে বিপুল পরিমাণ সিলিকা বালু জব্দ করলেও বাস্তব চিত্র বলছে- আইনের ফাঁকফোকর আর প্রভাবশালী চক্রের ছত্রছায়ায় এই অবৈধ কর্মকান্ড অব্যাহত রয়েছে।

জানা গেছে, গত মঙ্গলবার মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার লাংলিয়াছড়া ও উদনা ছড়ার বিভিন্ন স্থানে খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জনাব সৈকত রায়হানের নেতৃত্বে একটি মোবাইল কোর্ট অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে বিএমডির প্রসিকিউশন টিম এবং স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধিরা সার্বিক সহযোগিতা করেন।

এ সময় অবৈধভাবে উত্তোলিত মোট ৩,৪২০ (তিন হাজার চারশত বিশ) ঘনফুট সিলিকা বালু জব্দ করা হয়। পরবর্তীতে জব্দকৃত বালু সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের জিম্মায় সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া হয়। বিধি অনুযায়ী, এসব বালু উন্মুক্ত নিলামের মাধ্যমে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অবৈধ বালু উত্তোলন রোধে ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

শ্রীমঙ্গল উপজেলার চারপাশে বিস্তৃত পাহাড়ি বনাঞ্চল, চা-বাগান ও হাওরের বুক চিরে বয়ে চলা অসংখ্য পাহাড়ি ছড়া- যেগুলো স্থানীয়ভাবে ছোট নদী হিসেবেই পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, এসব ছড়াকে কেন্দ্র করে একটি সংঘবদ্ধ প্রভাবশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে সিলিকা বালু উত্তোলন ও পাচার করে আসছে। সূত্র জানায়, মাঝেমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে বালু পরিবহনকারী ট্রাকের ড্রাইভার বা হেলপারদের দুয়েকজন আটক হলেও মূল হোতারা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। কোটি টাকার চালান কেটে দায় সারা হলেও পর্দার আড়ালে থাকা নামধারী প্রভাবশালী নেতারা রয়ে যান অদৃশ্য।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এই অবৈধ চক্রের সঙ্গে জড়িতদের অধিকাংশই কোনো না কোনো প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল হলেও বালু লুটপাটে তারা প্রায় সবাই ঐক্যবদ্ধ। এর সঙ্গে প্রশাসনের কিছু অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশের কথাও উঠে আসছে।

এমনকি স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যেও দুয়েকজন এই অবৈধ কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে যখন স্থানীয় সংবাদিক মো. সাইফুল ইসলাম তার ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এক প্রভাবশালী সাংবাদিকের জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে পোস্ট দেন। এতে করে বিষয়টি জনমনে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, শ্রীমঙ্গল থানার ভূনবীর, সিন্দুরখান ও শ্রীমঙ্গল ইউনিয়নের অর্থনৈতিক হাব হিসেবে পরিচিত নোয়াগাঁও গ্রামের হেলদি চয়েজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ ম্যানুফ্যাকচারিং লিমিটেডের সামনের জাগছড়া থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। স্থানীয় কতিপয় ব্যক্তির নেতৃত্বে এসব বালু ট্রাকযোগে জোরপূর্বকভাবে শিল্পপতি সিরাজুল ইসলাম হারুন মিয়া, অঞ্জু বর্মন ও শ্রীমঙ্গল ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরীর মালিকানাধীন ভূমির ওপর দিয়ে পাচার করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে অভিযোগ দেয়া হলেও এখন পর্যন্ত জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলে জানা গেছে। অবৈধ বালু উত্তোলন ও পরিবহনের ভয়াবহ পরিণতিও ইতোমধ্যে প্রত্যক্ষ করেছে শ্রীমঙ্গল। অতীতে ভূনবীর ইউনিয়নের পাত্রীকুল এলাকায় বালুবাহী ট্রাকের চাপায় এক বৃদ্ধ মহিলা ও এক শিশু নিহত হন। একইভাবে সিন্দুরখান ইউনিয়নের বাজার এলাকায় এক ছাত্রের প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।

ভূনবীরের ঘটনায় স্থানীয় জনতা প্রশাসনের সামনে বিক্ষোভ ও স্লোগান দিয়ে বালু উত্তোলন বন্ধের দাবি জানালে কিছুদিন কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও পরে আবারও পুরোদমে শুরু হয় অবৈধ উত্তোলন।

স্থানীয় জনগণ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেকের কাছেই এসব ঘটনা ‘ওপেন সিক্রেট’ হলেও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। ধরপাকড় না হওয়ায় জনমনে গুঞ্জন বাড়ছে- তবে কি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কাছেই জিম্মি শ্রীমঙ্গলের পরিবেশ ও জননিরাপত্তা? পরিবেশবিদ ও সচেতন মহলের প্রশ্ন-পর্যটন নগরী শ্রীমঙ্গলের পাহাড়ি ছড়া, বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় অবৈধ সিলিকা বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে কবে কার্যকর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে?

‘সারাদেশ’ : আরও খবর

সম্প্রতি