image

নলকূপে পড়ে শিশু মৃত্যু: বাংলাদেশেই কেন বারবার ঘটে?

বিশ্লেষণ

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

ঘটনাটা ২০১৪ সালের ডিসেম্বরের। ঢাকার শাহজাহানপুরে জিহাদ নামের এক শিশু পরিত্যক্ত গভীর পাইপে পড়ে যায়। যে ঘটনা গোটা দেশেই আলোড়ন সৃষ্টি করে। তবে উদ্ধার অভিযান ব্যর্থ হওয়ায় শিশুটির মৃত্যু হয়। সেই ঘটনায় করা মামলায় প্রথমে ৪ জন দোষী সাব্যস্ত হলেও পরবর্তীতে হাইকোর্ট তাদের খালাস দেন। তবে আদালতের নির্দেশে রেলওয়ে ও ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ শিশু জিহাদের পরিবারকে ৩০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হয়।

সেই ঘটনার ঠিক ১০ বছর পর ২০২৪ সালের সেই ডিসেম্বরেই রাজশাহীর তানোরে পরিত্যক্ত গভীর নলকূপের গর্তে পড়ে ২ বছরের শিশু সাজিদের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। মায়ের সঙ্গে খেলতে গিয়ে সাজিদ প্রায় ৫০ ফুট গভীর গর্তে পড়ে পড়ে যায়। ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয়দের ৩২ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস অভিযানের পরদিন তাকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।

সর্বশেষ চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলায় গভীর নলকূপের জন্য খোঁড়া গর্তে পড়ে যাওয়া চার বছরের শিশু মেজবাহকে চার ঘণ্টা পর মৃত অবস্থায় উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিস। শিশুটির ঘরের ৩০-৪০ ফুট দূরে গত ৪-৫ বছর আগে সরকারিভাবে গভীর নলকূপের জন্য গর্ত খোঁড়া হয়। তবে সেখানে নলকূপ বসানো হয়নি। ঘটনার দিন বিকেলে খেলতে গিয়ে ওই গর্তে পড়ে যায় শিশুটি।

এভাবে বার বার নলকূপে পড়ে শিশুর মৃত্যুর ঘটনা জনমনে গভীর প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে ঘটে চলা এক ধরনের নীরব ও প্রতিরোধযোগ্য ট্র্যাজেডি। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্বজুড়ে যেখানে এমন ঘটনা বিরল, সেখানে বাংলাদেশে কেন বারবার এসব ঘটছে?

নলকূপে পড়ে শিশুর মৃত্যুর ঘটনা অনেকের কাছে ‘ভাগ্যের খেলা’ মনে হলেও বিশ্ব প্রমাণ করেছে, সচেতনতা, আইন ও দায়বদ্ধতা থাকলে এই ধরনের মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ কি শিশু জিহাদ, সাজিদের পর মেজবাহের মৃত্যুকেও আরেকটি ‘দুঃখজনক দুর্ঘটনা’ হিসেবে ভুলে যাবে, নাকি সত্যিকারের পরিবর্তনের দিকে যাবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুজতে হলে আগে বৈশ্বিক ঘটনাগুলোর দিকে তাকানো যায়।

বিশ্বে ঘটনা আছে, পুনরাবৃত্তি নেই : বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কূপ বা বোরওয়েলে শিশুদের পড়ে যাওয়ার ঘটনা বিরল নয়। ১৯৮৭ সালে আমেরিকার টেক্সাসে ‘বেবি জেসিকা’ নামের শিশু কূপে পড়ে ৫৮ ঘণ্টার নাটকীয় উদ্ধার অভিযানে বেঁচে গিয়েছিল। একইভাবে ২০১৯ সালে স্পেনের দুই বছর বয়সী জুলেন রোসেল্লো গভীর কূপে পড়ে মারা গেলে দেশজুড়ে শোকের পাশাপাশি কূপ নিরাপত্তা নিয়ে কঠোর আইন ও তদারকি জোরদার হয়। একই বছরে ভারতের তামিলনাডুতে পরিত্যক্ত কূপে পড়ে সুজিত উইলসন নামের শিশুর মৃত্যু দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। পরিত্যক্ত বোরওয়েলগুলো সিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়। ২০২২ সাালে মরক্কোতেও পাঁচ বছর বয়সী রায়ান কূপে পড়ে মারা গেলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে উদ্ধার ব্যবস্থার সক্ষমতা ও গ্রামীণ অবকাঠামো নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়।

বৈশ্বিক এসব ঘটনাগুলোর এক জায়গায় মিল রয়েছে, ঘটনার পরপরই রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। নিয়ম-কানুন কঠোর হয়েছে। ফলে একই ধরনের দুর্ঘটনা বার বার ঘটনার প্রবণতা বন্ধ হয়েছে। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন।

বাংলাদেশে ব্যতিক্রম নয়, নিয়ম : বাংলাদেশে নলকূপে পড়ে শিশুর মৃত্যুর ঘটনা নিয়মিত সংবাদে পরিণত হয়েছে। কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দশকের পর দশক ধরে দেশে বিপুল সংখ্যক নলকূপের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার ঘটেছে। আশির দশক থেকে নিরাপদ পানির জন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে কোটি কোটি নলকূপ বসানো হয়েছে। অথচ এসব নলকূপের লাইফ-সাইকেল ম্যানেজমেন্ট, অর্থাৎ নলকূপ অকেজো হলে তা কীভাবে অপসারণ বা স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হবে, সে বিষয়ে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে খোদ রাজধানী থেকে শুরু করে গ্রামবাংলায় অসংখ্য পরিত্যক্ত, অচল বা আধাখোলা নলকূপ রয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে পাইপ খুলে নেওয়া হলেও গর্ত খোলা থাকে। শিশুদের কৌতূহল, কম উচ্চতা ও পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব মিলিয়ে এসব নলকূপ পরিণত হচ্ছে মৃত্যুফাঁদে।

দায় কার : বিশ্বের বহু দেশে কূপ বা বোরহোল খননের জন্য লাইসেন্স লাগে। পরিত্যক্ত কূপ স্থায়ীভাবে সিল করা আইনত বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশে নলকূপ বসানোয় বিভিন্ন পক্ষ জড়িত, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, এনজিও, স্থানীয় সরকার, এমনকি ব্যক্তিগত উদ্যোগ। অথচ, নলকূপ অকেজো হলে কে দায় নেবে সেই প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট আইনি উত্তর নেই। এর ফল হলো দায়হীনতা। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার হয়। সেসব ঘটনা নিয়ে কিছুদিন আলোচনা হয়। প্রশাসন তৎপর হয়। তবে সময়ের কাছে হেরে যায়, চাপা পড়ে যায় মর্মান্তিক ঘটনাগুলো। এমনকি কোনো জাতীয় ডাটাবেসও নেই এসব ঘটনার। নেই শিশু-নিরাপত্তার ব্যবস্থাপনা।

‘দুর্ঘটনা’ না ‘ব্যবস্থাগত ব্যর্থতা’: আন্তর্জাতিকভাবে এ ধরনের ঘটনাকে ব্যবস্থার ব্যর্থতা বলা হয়। বাংলাদেশে একে প্রায়ই বলা হয় ‘দুর্ভাগ্যজনক দুর্ঘটনা’। এই শব্দচয়নের মধ্যেই দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য স্পষ্ট। যখন কোনো মৃত্যু দুর্ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়, তখন দায় খোঁজা হয় না। তবে যখন সেটিকে কাঠামোগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হয়, তখন সমাধানের চাপ তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন, সব নলকূপের ইউনিয়নভিত্তিক নিবন্ধনকরণ। পরিত্যক্ত নলকূপ স্থায়ীভাবে কংক্রিট দিয়ে সিল করার বাধ্যবাধকতা। নিয়মিত শিশু-ঝুঁকির বিষয় তদরকি করা। আর দায় নির্ধারণ ও আইনি ব্যবস্থা কঠোর করা।

‘সারাদেশ’ : আরও খবর

» কুমিল্লায় ৩৪৩ জন ‘সন্ত্রাসীর’ তালিকা ধরে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ

» বাড়ি ফেরার পথে এসএসসি পরীক্ষার্থী সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত

» বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মাসিক সমন্বয় সভা

সম্প্রতি