ব্রিটিশ ভারতে তৎকালীন দক্ষিণ শ্রীহট্ট মহকুমার (বর্তমান মৌলভীবাজার জেলা) শ্রীমঙ্গল থানা শহরের পূর্বাশা আবাসিক এলাকার এক শান্ত কোণে দাঁড়িয়ে আছে একটি সাধারণ বাড়ি- যে বাড়িটি একসময় ছিল জীবন সাঁওতালের। তিনি ছিলেন মাজডিহি চা-বাগানের সরদার, একজন শ্রমিক নেতা, শ্রীহট্ট চা শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সহসভাপতি এবং ব্রিটিশ ভারতের আসাম প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত এমএলএ। চা শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে তার নাম অমর হলেও স্বাধীনতার পর থেকে তার পরিচয় প্রায় বিস্মৃত হয়ে গেছে।
জীবন সাঁওতাল জন্মগ্রহণ করেন ২০শ শতকের প্রথমার্ধে দক্ষিণ শ্রীহট্টের মাজডিহি চা-বাগানে। তিনি সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর সন্তান, যারা দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীনতম আদিবাসী সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। ব্রিটিশ শাসনামলে বিহার ও ছোটনাগপুর থেকে আনা শ্রমিকদের মতোই তার পরিবার কঠোর শ্রম, সীমিত মজুরি এবং সামাজিক বঞ্চনার মধ্য দিয়ে জীবন কাটিয়েছে।
পরিস্থিতি কঠোর হলেও জীবন সাঁওতাল মাজডিহি চা-বাগানের শ্রমিকদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশ করলেন। সরদার হিসেবে তার সাহস, সততা ও নৈতিকতা তাকে শ্রমিকদের আস্থা ও সমর্থনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছিল। তবে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের তার সংগ্রাম চা-বাগান কর্তৃপক্ষের রোষানলে ফেলেছিল এবং শেষ পর্যন্ত তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। চাকরি হারানোর পর জীবন সাঁওতাল শ্রীমঙ্গলের পূর্বাশা আবাসিক এলাকায় বিপুল জমি ক্রয় করে পরিবারসহ সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। এই জমি পরবর্তীতে তার পরিবার ও উত্তরসূরিদের জন্য এক মূল্যবান ঐতিহ্য হিসেবে রয়ে যায়।
তার একমাত্র ছেলে, কৃষ্ণ সাঁওতাল, জীবন সাঁওতালের মৃত্যুর পর জমির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কৃষ্ণ সাঁওতাল কিছু অংশ বিক্রি করলেও কয়েক শতক জমি তিনি সন্তান ও নাতি-নাতনিদের জন্য রেখে যান। কৃষ্ণ সাঁওতাল ২০০৭ সালে এবং তার স্ত্রী ২০১৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন। বর্তমানে তাদের সন্তান-সন্ততিরা এই জমিতে নির্মিত বাড়িতে নীরবে বসবাস করছেন।
ভারতভাগের পূর্বে জীবন সাওতাল তৎকালীন কংগ্রেস নেতা পূর্ণেন্দু কিশোর সেনগুপ্ত ও নিকুঞ্জ চৌধুরীর সঙ্গে যৌথভাবে শ্রীহট্ট চা শ্রমিক ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তাদের লক্ষ্য ছিল শ্রমিকদের সংগঠিত করে ন্যায্য মজুরি, মানবিক কর্মঘণ্টা, উন্নত আবাসন ব্যবস্থা এবং শ্রমিক সন্তানদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা। ৩ জুন ১৯৪৮ সালে কুলাউড়ায় তিনি শ্রীহট্ট চা শ্রমিক ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা তৎকালীন প্রখ্যাত সর্বভারতীয় কংগ্রেস ও শ্রমিক নেতা পূর্ণেন্দু কিশোর সেনগুপ্ত করেন। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী নেতা পূর্ণেন্দু কিশোর সেনগুপ্ত ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, তার সঙ্গে ছিলেন এমএলএ জীবন সাঁওতাল (সহসভাপতি), নিকুঞ্জ বিহারী চৌধুরী (সাধারণ সম্পাদক) এবং দুর্গেশ দেব (সাংগঠনিক সম্পাদক)। এটি পরবর্তীতে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন নামে পরিচিত হয়, যা আজও দেশের প্রায় সাত লক্ষাধিক চা শ্রমিকের প্রতিনিধিত্ব করছে।
১৯৪৬ সালে ভারতীয় কংগ্রেসের টিকেটে জীবন সাঁওতাল আসাম প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে শ্রীমঙ্গল আসন থেকে বিজয়ী হন। এমএলএ নির্বাচিত হওয়ার পরও তিনি চা-বাগানের শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করতে অক্লান্তভাবে কাজ করেন। তিনি ন্যায্য মজুরি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রজন্মগত দাসত্বের অবসানের জন্য অ্যাসেম্বলির আন্দোলন চালিয়েছেন। ভারতভাগের পর ১৯৫৪ সালের পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক নির্বাচনে তিনি যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হন। প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ একে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মৌলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বাধীন এই জোটে তিনি চা শ্রমিক, সংখ্যালঘু ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিরল প্রতিনিধি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৬০ সালে পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খানের নির্দেশে সমস্ত ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। জীবন সাঁওতাল ধীরে ধীরে জনজীবন থেকে সরে যান এবং তার অবদান ক্রমে শ্রমিক আন্দোলনের রেকর্ড থেকে মুছে যায়। দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন তার কোনো ছবি, লিখিত ইতিহাস বা পরিবার সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করতে পারেনি। বর্তমান নেতৃত্বও তার উত্তরসূরির অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত নয়। জীবন সাঁওতালের জীবনগাথা অসাধারণ রূপান্তরের সাক্ষ্য। চা-বাগানের শ্রমিক জীবন থেকে উঠে এসে তিনি জাত, শ্রেণি ও ঔপনিবেশিক শাসনের বাধা ভেঙে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি শুধু একজন শ্রমিক নেতা বা রাজনীতিবিদ নন, তিনি ক্ষমতাহীন মানুষের সঙ্গে ক্ষমতার কেন্দ্রে সেতুবন্ধন ছিলেন।
তাকে স্মরণ করা মানে শুধুই এক বিস্মৃত নেতাকে সম্মান জানানো নয়, এটি চা শ্রমিকদের দীর্ঘ সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে পুনরুদ্ধার করার একটি প্রয়াস।