image
সাপাহার (নওগাঁ) : গাছে গাছে আমের মুকুল -সংবাদ

আমের মুকুলে জেগে উঠছে বরেন্দ্রের কৃষকের স্বপ্ন

প্রতিনিধি, সাপাহার (নওগাঁ)

বরেন্দ্রভূমির খরতাপে যে মাটিকে একসময় অনুর্বর বলে মনে করা হতো, সেই মাটিতেই এখন সম্ভাবনার সুবাস ছড়াচ্ছে আমের মুকুল। নওগাঁর সাপাহার উপজেলায় গাছে গাছে মুকুলের আগমনে নতুন মৌসুমের সোনালী স্বপ্ন দেখছেন হাজারো আমচাষি, ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা।

গতকাল শুক্রবার সাপাহার উপজেলার নুরপুর গ্রামের একটি আমবাগান ঘুরে দেখা যায়, সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে মুকুলে ভরে উঠেছে গাছের ডাল। সংশ্লিষ্টরা জানান, এই অঞ্চলের আম মূলত সাপাহার বাজারকে কেন্দ্র করেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও দেশের বাহিরে সরবরাহ হয়ে থাকে। ফলে এখানকার মুকুলের অবস্থা পুরো মৌসুমের উৎপাদন ও বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।

আমি চাষি মো. বারিক আলী, সদর ইউনিয়নের আদর্শ গ্রামের বাসিন্দা। তিনি বলেন, এ বছর শীতের তাপমাত্রা ও আবহাওয়া এখন পর্যন্ত অনুকূলে থাকায় গাছে ভালো মুকুল এসেছে সামনে কিছু দিনের মধ্যেই পুরো পুরি মুকুল দেখা দিবে এজন্য নিয়মিত পরিচর্যা করা হচ্ছে। তবে সামনে অকাল ঝড়-বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি ও পোকামাকড়ের আক্রমণ নিয়ে দুশ্চিন্তা রয়েছে।

তার মতো সাপাহারের হাজারো চাষির কাছে এই মুকুল শুধু ফুল নয় এটি পুরো বছরের আয়, সংসারের স্বচ্ছলতা এবং স্থানীয় অর্থনীতির ভিত্তি।

স্থানীয় আম ব্যবসায়ী মো. হাসান আলী বলেন, সাপাহারের আমের চাহিদা সবসময়ই বেশি, মুকুল ভালো হলে আগাম অর্ডার ও বাজার প্রস্তুতি শুরু করা যায়। এখন থেকেই আমরা বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। এ বিষয়ে সাপাহার আম আড়ৎদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক রিফাত হোসেন বলেন, ‘সাপাহার এখন আমের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত। মুকুলের বর্তমান অবস্থা খুবই আশাব্যঞ্জক। বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এ বছর আমের বাজার ভালো হবে বলে আমরা আশা করছি।’ তিনি আরও বলেন, আড়তদাররা পরিবহন, সংরক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনায় আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

স্থানীয় কৃষি বিভাগ ও বাজার-সংশ্লিষ্টদের মতে, সাপাহার এখন দেশের অন্যতম বড় আম উৎপাদন ও বিপণনকেন্দ্র। প্রতি বছর আম মৌসুমে এখানে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকার, ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের ব্যাপক সমাগম ঘটে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সাপাহারে আম চাষের জমি প্রায় ৯ হাজার ২৮০ হেক্টর, চলতি মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন, যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

সাপাহারে উৎপাদিত বিভিন্ন জাতের মধ্যে ‘রূপালি’ আম সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, ভালো স্বাদ ও বাজারদরের কারণে প্রায় ৭৫ শতাংশ বাগানেই রূপালি জাতের আম চাষ হচ্ছে। পাশাপাশি গুটি, আশ্বিনা, গোপালভোগ, হিমসাগর (খিরসাপাত), ল্যাংড়া, ফজলি, আম্রপালি, কাটিমনসহ দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রায় ১৫-১৬ জাতের আম উৎপাদিত হয়। চাষি ও ব্যবসায়ীরা জানান, মুকুল আসার পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো অকাল ঝড়-বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, রোগবালাই ও বরেন্দ্র অঞ্চলের খরা। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় কৃষি অফিস নিয়মিত পরামর্শ ও তদারকি করছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

সাপাহারের আমবাগানে আজ যে মুকুল দোল খাচ্ছে, তা কেবল ঋতুর আগমনের বার্তা নয় এটি বরেন্দ্র অঞ্চলের অর্থনীতির প্রাণস্পন্দন। এছাড়া এখানকার আমের সুনাম দেশের গ-ি পেরিয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়ছে। সময়মতো পরিচর্যা, সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনা, মান নিয়ন্ত্রণ ও রপ্তানিমুখী অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে ‘আমের বাণিজ্যিক রাজধানী’ সাপাহার দেশের কৃষি অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখবে এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।

‘সারাদেশ’ : আরও খবর

সম্প্রতি