ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুরের ছয়টি আসনে এবার রেকর্ডসংখ্যক ৪৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এরমধ্যে তিনটি আসনে ভিভিআইপি প্রার্থীরা অংশ নিচ্ছেন। তারা প্রত্যেকেই বিষয়টিকে প্রেস্টিজ ইস্যু হিসেবে নিয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছেন।
৩ ভিভিআইপি প্রার্থীর দৌড়ঝাঁপ
গণভোটের প্রচারণা কম
নির্বাচনের এখনও ১১ দিন বাকি থাকলেও প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের মধ্যে যে উত্তাপ তৈরি হয়েছে, সাধারণ ভোটারদের মধ্যে তেমন উদ্দীপনা ও আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। প্রার্থীরা ভোট প্রার্থনা করলেও গণভোট নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। তবে এবারের নির্বাচনে নারী ভোটাররাই হতে পারেন তুরুপের তাস যাদের সমর্থন পাবেন, তারাই শেষ হাসি হাসবেন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
রংপুরের ছয়টি আসনেই বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন ও জাতীয় পার্টি প্রার্থী দিলেও জাতীয় পার্টির রংপুর-১ আসনের প্রার্থী ব্যারিস্টার মজুম আলীর মনোনয়নপত্র সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ কর্তৃক বাতিল হওয়ায় এ আসনে জাতীয় পার্টির কোনো প্রার্থী নেই।
রংপুরে মোট ভোটার ২৫ লাখ ৯৯ হাজার ২০২ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ১২ লাখ ৯২ হাজার এবং নারী ভোটার ১৩ লাখ ৬ হাজার ৩০৩ জন।
আসনভিত্তিক প্রার্থী তালিকা
রংপুর-১ আসন: ৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন- বিএনপির মোকাররম হোসেন সুজন, জামায়াতের রায়হান সিরাজী, ইসলামী আন্দোলনের গোলাম মোস্তফা বাবু, বাসদ (মার্কসবাদী) আরেফিন তিতু ও ইসলামী ফ্রন্টের মো. আনাস।
রংপুর-২ আসন: ৫ জন প্রার্থী। তারা হলেন- জামায়াতের নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম, বিএনপির মোহাম্মদ আলী সরকার, জাতীয় পার্টির আনিসুল হক মণ্ডল, ইসলামী আন্দোলনের মাওলানা আশরাফ ও বাসদের আজিজার রহমান।
রংপুর সদর-৩ আসন: ৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন- বিএনপির শামসুজ্জামান শামু, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের, জামায়াতের মাহবুবার রহমান বেলাল, ইসলামী আন্দোলনের আমিরুজ্জামান পিয়াল, বাসদের আব্দুল কুদ্দুস, তৃতীয় লিঙ্গের স্বতন্ত্র প্রার্থী আনোয়ারা ইসলাম রানী এবং বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী রীতা রহমান।
রংপুর-৪ আসন: ৭ জন প্রার্থী। তারা হলেন- জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব আকতার হোসেন, বিএনপির এমদাদুল হক ভরসা, জাতীয় পার্টির মাহবুবার রহমান, ইসলামী আন্দোলনের জাহিদ হোসেন, বাসদ (মার্কসবাদী) প্রগতি বর্মণ, বাংলাদেশ কংগ্রেস পার্টির উজ্জ্বল চন্দ্র বর্মণ ও খেলাফত মজলিসের আবু সাহাব উদ্দিন।
রংপুর-৫ আসন: ৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন- বিএনপির গোলাম রব্বানী, জামায়াতের অধ্যাপক গোলাম রব্বানী, জাতীয় পার্টির ফকরুজ্জামান জাহাঙ্গীর, ইসলামী আন্দোলনের গোলজার হোসেন, সিপিবির আবু হেলাল, নাগরিক ঐক্যের মোবাখখারুল ইসলাম নবাব, বাসদের বাবুল আখতার এবং এবি পার্টির আব্দুল বাসেত মারজান।
রংপুর-৬ আসন: ৭ জন প্রার্থী। তারা হলেন- বিএনপির সাইফুল ইসলাম, জামায়াতের নুরুল আমিন, জাতীয় পার্টির নুর আলম যাদু, এবি পার্টির সাদিকুল ইসলাম, ইসলামী আন্দোলনের সুলতান মাহমুদ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী আবু জাফর জাহিদ।
ভিভিআইপি প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ
রংপুরের তিনটি আসনে তিনজন ভিভিআইপি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন- রংপুর-২ আসনে জামায়াতের নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম, রংপুর সদর-৩ আসনে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের এবং রংপুর-৪ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব আকতার হোসেন।
তিনজনই নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় অবস্থান করে দিন-রাত গণসংযোগ, উঠান বৈঠক, সভা-সমাবেশ এবং সরাসরি ভোটারদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে লিফলেট বিতরণ করছেন। গতকাল রংপুর-৪ আসনের প্রার্থী আকতার হোসেন সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নিজের এলাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরে ইশতেহার ঘোষণা করেন। একইদিনে জিএম কাদের দিনভর রংপুর নগরীর সিটি বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় দোকানে দোকানে গিয়ে ভোট প্রার্থনা করেন এবং গত শুক্রবার গভীর রাত পর্যন্ত গণসংযোগ চালান। তারা দুজনই নিজেদের জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী বলে জানিয়েছেন।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে পরে সুপ্রিম কোর্ট থেকে খালাস পাওয়া জামায়াতের নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম রংপুর-২ আসনে দিন-রাত গণসংযোগ ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে ভোট প্রার্থনা করছেন।
জামায়াত ও বিএনপির অবস্থান
রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, রংপুরের ছয়টি আসনে ১৯৯১ সালসহ কোনো নির্বাচনে বিএনপি বা জামায়াতের কোনো প্রার্থী জয়ী হতে পারেনি। সর্বশেষ ২০১৮ সালের নির্বাচনে রংপুর-২ আসনে
বিএনপি প্রার্থী মোহাম্মদ আলী সরকার প্রায় ৫০ হাজার ভোট পেয়েছিলেন। তবে বিএনপি ও জামায়াতের অধিকাংশ প্রার্থী জামানত পর্যন্ত রক্ষা করতে পারেননি।
১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে জাতীয় পার্টির জনপ্রিয়তার কারণে রংপুরের সব আসনেই তারা জয়ী হয়। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ দুটি আসনে জয়ী হয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পায়। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ চারটি আসনে জয়ী হলেও রংপুর সদর-৩ আসনে ১৯৯১ সালের পর থেকে জাতীয় পার্টিই আধিপত্য বজায় রেখেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াত দুইটি করে আসনে জয়ী হতে পারে। তবে তিন দলের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে তারা মনে করছেন। অন্যদিকে রংপুর-৪ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব আকতার হোসেন নিজেকে জয়ী হওয়ার ব্যাপারে অত্যন্ত আশাবাদী হলেও সেখানে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে হবে বলে মত সংশ্লিষ্টদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নির্বাচন বিশ্লেষক বলেন, ২০০৮ সাল পর্যন্ত বিএনপি ও জামায়াত একটি আসনেও জয়ী হতে না পারলেও এবারের রাজনৈতিক বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন। দুই দলই ভালো ফলাফল করতে পারে।
# গণভোটে প্রচারণা কম
রংপুরের ছয়টি আসনে বিএনপি ও জামায়াত সমানতালে ব্যাপক নির্বাচনী প্রচারণা চালালেও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গণভোট নিয়ে প্রচারণা তুলনামূলকভাবে কম। তবে গত শুক্রবার রংপুরে আয়োজিত জনসভায় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়ার আহ্বান জানালে ব্যাপক সাড়া পড়ে।
তবুও প্রার্থীরা নিজেদের পক্ষে ভোট চাইছেন, গণভোটের পক্ষে সরাসরি প্রচারণা তুলনামূলকভাবে কম। সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ এখনও গণভোটের উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অবগত নয়।
এ বিষয়ে সুজন রংপুর জেলা সভাপতি ফকরুল আনাম বেগ জানান, গণভোটের পক্ষে প্রচারণা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। কেন গণভোটে ভোট দেয়া জরুরি সে বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা আরও সক্রিয় হওয়া দরকার।